কোনো বিষয় পাঠ করে তার মূলভাব বুঝতে পারার ক্ষমতাকে অনুধাবন-দক্ষতা বলে। যার অনুধাবন-দক্ষতা যত বেশি, সে একটি বিষয় তত দ্রুত বুঝতে পারে। অনুধাবন-দক্ষতা যে কোনো বিষয়কে ভালোভাবে আয়ত্ত করতে সাহায্য করে। কোনো বিষয় না-বুঝে মুখস্থ করলে তা বেশি দিন মনে থাকে না। বিষয়টি বুঝে চর্চা করলে তা স্থায়ী হয়। এভাবে বোঝা ও লেখার চর্চা করাই হলো অনুধাবন। অনুধাবন-দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত চর্চা করতে হয়। বিষয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝার জন্য শব্দের অর্থ, বাক্য এবং বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে।
নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও।
১. দিনের বেলা সোনার থালার মতো সূর্য তার কিরণ ছড়ায় চারপাশে। এমনি সময়ে সচরাচর আকাশ নীল। কখনো সাদা বা কালো মেঘে ঢেকে যায়। ভোরে বা সন্ধ্যায় আকাশের কোনো কোনো অংশে নামে রঙের বন্যা। কখনো-বা সারা আকাশ ভেসে যায় লাল আলোয়। রাতের আকাশ সচরাচর কালো হয়, কিন্তু সেই কালো চাঁদোয়ার গায়ে জ্বলতে থাকে রুপালি চাঁদ আর অসংখ্য ঝকঝকে তারা ও গ্রহ।
ক. দিনের বেলা আকাশের রং কেমন থাকে?
খ. রাতের বেলা আকাশে চাঁদ ও তারা দেখা যায় কেন?
গ. দিন ও রাতে আকাশে রঙের যে পার্থক্য দেখা যায় তা লেখ।
ঘ. তোমার দেখা আকাশের সঙ্গে অনুচ্ছেদের আকাশের মিল কোথায়?
ঙ. খালি চোখে দেখা আকাশ আর অনুচ্ছেদে বর্ণিত আকাশ কি একই? ব্যাখ্যা কর।
নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও।
২. কলকাতার এক নোংরা বস্তিতে মাদার তেরেসা প্রথম স্কুল খুললেন। বেঞ্চ-টেবিল কিছু নেই, মাটিতে দাগ কেটে শিশুদের শেখাতে লাগলেন বর্ণমালা। অসুস্থদের সেবার জন্য খুললেন চিকিৎসাকেন্দ্র। ধীরে-ধীরে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন অনেক মানুষ। মাদার তেরেসার কাজের পরিধি ক্রমাগত বেড়ে চলল। তাঁর সঙ্গে যোগ দিলেন আরও অনেকে। তাঁদের নিয়ে তিনি গড়লেন মানবসেবার সংঘ 'মিশনারিজ অভ চ্যারিটি'।
ক. মাদার তেরেসার গঠিত সংঘটির নাম কী?
খ. মাদার তেরেসাকে কেন মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল?
গ. মাদার তেরেসা কীভাবে মানবসেবায় এগিয়ে আসলেন? সংক্ষেপে বুঝিয়ে দাও।
ঘ. 'মানবসেবার জন্য অর্থের দরকার নাই, দরকার সদিচ্ছা'- উক্তিটি বুঝিয়ে দাও।
ঙ. মাদার তেরেসার এই কাজ কী নামে অভিহিত করা যায়?
নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও।
৩. রাজার দল এখন আর নেই। গুপ্ত-খড়গ, পাল-সেন, পাঠান-মুঘল, কোম্পানি-রানি এদের কাল শেষ হয়েছে। আজকের দুই কবিও হয়তো দুই প্রান্তে বসে কবিতা লিখছেন। একজন লিখছেন সমৃদ্ধির কথা, বিলাসের কথা, আনন্দের কথা; আরেকজন ছবি আঁকছেন নিদারুণ অভাবের, জ্বালাময় দারিদ্র্যের, অপরিসীম বেদনার।
ক. কীসের দল এখন আর নেই?
খ. কাদের দিন শেষ হয়েছে? কেন?
গ. দুই কবির মিল কোন দিক থেকে? ব্যাখ্যা কর।
ঘ. 'দুই কবির মধ্যে মিল থাকা সত্ত্বেও বিস্তর ব্যবধান।'- বুঝিয়ে দাও।
ঙ. দ্বিতীয় কবির ভাবনা একটি উদহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও।
কোনো নির্দিষ্ট দীর্ঘ রচনাকে সহজবোধ্য করে এর বিষয়বস্তু লেখা বা পরিবেশন করাকে সারাংশ বলে। সারাংশ লেখার জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। সেগুলো অবশ্যই মানতে হবে। প্রথমেই অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে মূল রচনাটি পড়তে হবে। একবার পড়ে বক্তব্য স্পষ্ট না হলে একাধিকবার পড়তে হবে। লেখার সময় অবশ্য মনে রাখতে হবে যে, কোনো অপ্রয়োজনীয় কিছু লেখা যাবে না। বক্তব্য যত সহজে বলা যায় ততই ভালো। মূলে কোনো দৃষ্টান্ত, কোনোকিছুর সঙ্গে তুলনা করে কোনো উদাহরণ দেওয়া থাকলে তা বাদ দিতে হবে। সারাংশ সবসময়ই মূলের থেকে ছোট হবে।
এক
ভাত বাঙালির বহুকালের প্রিয় খাদ্য। এ অঞ্চলের সরু সাদা চালের গরম ভাতের কদর সবচাইতে বেশি ছিল বলে মনে হয়। পুরোনো সাহিত্যে ভালো খাবারের নমুনা হিসেবে যে-তালিকা দেওয়া হয়েছে, তা হলো কলার পাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, নালিতা শাক, মৌরলা মাছ আর খানিকটা দুধ। লাউ, বেগুন ইত্যাদি তরকারি প্রচুর খেত সেকালের বাঙালিরা, কিন্তু ডাল তখনো বোধহয় খেতে শুরু করেনি। মাছ তো প্রিয় বস্তুই ছিল। বিশেষ করে ইলিশ মাছ। শুঁটকির চল সেকালেও ছিল বিশেষ, করে দক্ষিণাঞ্চলে। ছাগলের মাংস সবাই খেত। হরিণের মাংস বিয়েবাড়িতে বা এরকম উৎসবে দেখা যেত। পাখির মাংসও তা-ই। সমাজের কিছু লোক শামুক খেত। ক্ষীর, দই, পায়েস, ছানা- এসব ছিল বাঙালির নিত্যপ্রিয়। আম-কাঁঠাল, তাল-নারকেল ছিল প্রিয় ফল। খুব চল ছিল নাড়ু, পিঠেপুলি, বাতাসা, কদমা- এসবের। মসলা-দেওয়া পান খেতে সকলে ভালোবাসত।
সারাংশ: বাঙালি জাতির জীবনযাত্রার খাদ্যাভ্যাস অন্যতম। প্রাচীনকাল থেকে এদেশের মানুষ বিচিত্র ধরনের সাধারণ খাবার খেত। উৎসব বা বিয়েতে হরিণের মাংস পরিবেশন করা হতো। সমাজের সকল স্তরের ও অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাস প্রায় একই ধরনের ছিল।
দুই
মা-মরা মেয়ে মিনু। বাবা জন্মের আগেই মারা গেছে। সে মানুষ হচ্ছে এক দূরসম্পর্কের পিসিমার বাড়িতে। বয়স মাত্র দশ, কিন্তু এ-বয়সেই সব রকম কাজ করতে পারে সে। লোকে অবশ্য বলে যোগেন বসাক মহৎ লোক বলেই অনাথা বোবা মেয়েটাকে আশ্রয় দিয়েছেন। মহৎ হয়ে সুবিধাই হয়েছে যোগেন বসাকের। পেটভাতায় এমন সর্বগুণান্বিতা চব্বিশ ঘণ্টার চাকরানি পাওয়া শক্ত হতো তাঁর পক্ষে। বোবা হওয়াতে আরও সুবিধা হয়েছে, নীরবে কাজ করে। মিনু শুধু বোবা নয়, কালাও। অনেক চেঁচিয়ে বললে, তবে শুনতে পায়। সব কথা শোনার দরকার হয় না তার। ঠোঁটনাড়া আর মুখের ভাব দেখে সব বুঝতে পারে। এ ছাড়া তার আর-একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে যার সাহায্যে সে এমন সব জিনিস বুঝতে পারে, এমন সব জিনিস মনে-মনে সৃষ্টি করে, সাধারণত বুদ্ধিতে যার মানে হয় না। মিনুর জগৎ চোখের জগৎ, দৃষ্টির ভেতর দিয়েই সৃষ্টিকে গ্রহণ করেছে সে।
সারাংশ: সমাজ বিচিত্র মানুষের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। কেউ সর্বাঙ্গে সুস্থ, কেউ-বা সম্পূর্ণভাবে সুস্থ নয়। বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী হয়ে ছোট্ট মেয়ে মিনু দুঃখ কষ্টে জর্জরিত। তারপরও জীবনকে তুচ্ছ মনে না করে সে কর্মের মধ্য দিয়ে নিজের জগৎ সৃষ্টি করে নিয়েছে।
তিন
আগেকার দিনে লোকে ভাবত, আকাশটা বুঝি পৃথিবীর উপর একটাকিছু কঠিন ঢাকনা। কখনো তারা ভাবত, আকাশটা পরতে পরতে ভাগ করা।
আজ আমরা জানি, আকাশের নীল চাঁদোয়াটা সত্যি সত্যি কঠিন কোনো জিনিসের তৈরি নয়। আসলে এ নিতান্তই গ্যাস-ভর্তি ফাঁকা জায়গা। হরহামেশা আমরা যে আকাশ দেখি তা হলো আসলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ঢাকনা। সেই বায়ুমণ্ডলে রয়েছে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড-এমনি গোটা কুড়িটি বর্ণহীন গ্যাসের মিশেল। আর আছে পানির বাষ্প ধুলোর কণা।
সারাংশ: আকাশকে একসময় মানুষের মাথার উপর ঢাকনা মনে করা হতো। আসলে তা ঢাকনা নয়, রং বায়ুর বিপুল স্তর। এখানে প্রায় বিশটি বর্ণহীন গ্যাস ও পানির বাষ্প আর ধুলোর কণা মিশে আছে ।
চার
আগেকার দিনে আমাদের আকাশ নিয়ে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন শূন্যে বেলুন পাঠিয়ে বা যন্ত্রপাতিসুদ্ধ রকেট পাঠিয়ে। আজ মানুষ নিজেই মহাকাশযানে চেপে সফর করছে পৃথিবীর উপরে বহু দূর পর্যন্ত। পৃথিবী ছাড়িয়ে তারা যেতে পেরেছে চাঁদে। পৃথিবীর উপর দেড়শো দুশো মাইল বা তারও অনেক বেশি উপর দিয়ে ঘুরছে অসংখ্য মহাকাশযান। যেখান দিয়ে ঘুরছে সেখানে হাওয়া নেই বললেই চলে।
মহাকাশযান থেকে দিনরাত তোলা হচ্ছে পৃথিবীর ছবি। জানা যাচ্ছে কোথায় কখন আবহাওয়া কেমন হবে, কোন দেশে কেমন ফসল হচ্ছে। মহাকাশযান থেকে ঠিকরে দেওয়া হচ্ছে টেলিফোন আর টেলিভিশনের সংকেত। এজন্য দূরদেশের সঙ্গে যোগাযোগ আজ অনেক সহজ হয়ে উঠেছে।
সারাংশ: বর্তমানে বেলুনের পরিবর্তে মহাকাশযান পাঠিয়ে আকাশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আর এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগব্যবস্থা বিস্তৃত হয়েছে। টেলিভিশন, ফোন, সেলফোন, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট ইত্যাদির মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে সংকেত।
প্রদত্ত পাঠের সংক্ষিপ্ত মর্ম তথা সার উল্লেখ করাকে সারমর্ম বলা হয়। ইংরেজি Substance-এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে সারমর্ম শব্দটি ব্যবহৃত হয়। একে মর্মসত্য বা মর্মার্থ বলা হয়। সারাংশ লেখার ক্ষেত্রে সহজভাবে আসল বক্তব্য অনুধাবন করে লিখতে হয়। সারমর্ম লেখার জন্য মূল রচনার মধ্য দিয়ে কী বলা হয়েছে, তা সংক্ষেপে নিজের ভাষায় উপস্থাপন করতে হয়। আমরা মনে রাখব, সারাংশ বিষয়সংক্ষেপ আর সারমর্ম বিষয়ের অন্তর্নিহিত বক্তব্য। সারমর্ম যেহেতু বিষয়ের অন্তর্নিহিত বক্তব্য, তাই তা প্রদত্ত বিষয়ের চেয়ে আকারে ছোট করে লিখতে হয়।
এক
সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে
সার্থক জনম মা গো, তোমায় ভালোবেসে।।
জানি নে তোর ধনরতন
আছে কি না রানির মতন,
শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে॥
কোন বনেতে জানি নে ফুল
গন্ধে এমন করে আকুল,
কোন গগনে ওঠে রে চাঁদ এমন হাসি হেসে।।
আঁখি মেলে তোমার আলো
প্রথম আমার চোখ জুড়ালো
ওই আলোতে নয়ন রেখে মুদব নয়ন শেষে।
সারমর্ম: ধনরত্নে পূর্ণ না থাকলেও মাতৃভূমি প্রতিটি মানুষের কাছেই প্রিয়। স্বদেশ পূর্ণতা দেয়, আর এজন্য মানুষ শেষ আশ্রয়টুকু দেশের মাটিতেই চায়।
দুই
পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পরের কারণে মরণেও সুখ;
'সুখ' 'সুখ' করি কেঁদ না আর,
যতই কাঁদিবে, যতই ভাবিবে
ততই বাড়িবে হৃদয় ভার।
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী 'পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা,
প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।
সারমর্ম: ত্যাগের মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত সুখ। অন্যকে বাদ দিয়ে কেউ একা চলতে পারে না। সুখী হতে পারে না। সব মানুষেরই দায়িত্ব অন্যের আনন্দ-বেদনাকে নিজের বলে গ্রহণ করা। এভাবেই সমাজে সকল মানুষ সুখী হতে পারে।
তিন
জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে
সে জাতির নাম মানুষ জাতি;
এক পৃথিবীর স্তন্যে লালিত
একই রবি শশী মোদের সাথি।
শীতাতপ ক্ষুধা তৃষ্ণার জ্বালা
সবাই আমরা সমান বুঝি,
কচি কাঁচাগুলো ডাঁটো করে তুলি
বাঁচিবার তরে সমান যুঝি।
দোসর খুঁজি ও বাসর বাঁধি গো,
জলে ডুবি, বাঁচি পাইলে ডাঙা,
কালো আর ধলো বাহিরে কেবল
ভিতরে সবারই সমান রাঙা।
সারমর্ম: জাতি, ধর্ম, গাত্রবর্ণে পার্থক্য থাকলেও এসকল পরিচয়ের ঊর্ধ্বে হচ্ছে মানুষ জাতি। সব মানুষের অনুভূতিই সমান। মানুষে-মানুষে পার্থক্য করা তাই অন্যায়। সকলের অনুভূতিকে মূল্য দিয়ে একসঙ্গে জীবনযাপন করলেই পৃথিবী সুন্দর হবে।
সারাংশ লেখ:
১. সাজসজ্জার দিকে বেশ ঝোঁক ছিল প্রাচীন বাঙালির। চুলের বাহার ছিল দেখবার মতো। মাথার উপরে চুড়ো করে বাঁধত চুল। এখন মেয়েরা যেমন ফিতে বাঁধে চুলে, তখন শৌখিন পুরুষেরা অনেকটা তেমনি করে কোঁকড়া চুল কপালের উপর বেঁধে রাখত। মেয়েরা নিচু করে 'খোঁপা' বাঁধত নয়তো উঁচু করে বাঁধত 'ঘোড়াচূড়'। কপালে টিপ দিত, পায়ে আলতা, চোখে কাজল আর খোঁপায় ফুল। নানারকম প্রসাধনীও ব্যবহার করত তারা।
মেয়েরা তো বটেই, ছেলেরাও সে-যুগে অলংকার ব্যবহার করত। সোনার অলংকার পরতে পেত শুধু বড়লোকেরা। তাদের বাড়ির ছেলেরা সুবর্ণকুণ্ডল পরত, মেয়েরা কানে দিত সোনার 'তারঙ্গ'। হাতে, বাহুতে, গলায়, মাথায় সর্বত্রই সোনামণিমুক্তো শোভা অভিজাত তাদের মেয়েদের। সাধারণ পরিবারের মেয়েরা হাতে পরত শাঁখা, কানে কচি কলাপাতার মাকড়ি, গলায় ফুলের মালা।
২. আকাশ যদি বর্ণহীন গ্যাসের মিশেল, তবে তা নীল দেখায় কেন? মাঝে মাঝে সাদা আর লাল রঙের খেলাই-বা দেখি কী করে? আসলে সাদা মেঘে জলীয় বাষ্প জমে তৈরি হয় অতি ছোট ছোট অসংখ্য পানির কণা। কখনো মেঘে এসব কণার গায়ে বাষ্প জমার ফলে তা ভারী হয়ে বড় পানির কণা তৈরি হয়। তখন সূর্যের আলো তার ভেতর দিয়ে আসতে পারে না, আর তাই সে-মেঘের রং হয় কালো। কিন্তু সারাটা আকাশ সচরাচর নীল রঙের হয় কী করে, আকাশ নীল দেখায় বায়ুমণ্ডলে নানা গ্যাসের অণু ছড়িয়ে আছে বলে। এইসব গ্যাসের কণা খুব ছোট মাপের আলোর ঢেউ সহজে ঠিকরে ছিটিয়ে দিতে পারে। এই ছোট মাপের আলোর ঢেউগুলোই আমরা দেখি নীল রং হিসেবে। অর্থাৎ পৃথিবীর উপর হাওয়ার স্তর আছে বলেই পৃথিবীতে আকাশকে নীল দেখায়।
সারমর্ম লেখ:
২
শ্যামলী মায়ের কোলে সোনামুখ খুকু রে,
আলুথালু ঘুমু যাও রোদে গলা দুপুরে।
প্রজাপতি ডেকে যায়-
'বোঁটা ছিঁড়ে চলে আয়!'
আসমানে তারা চায়-
‘চলে আয় এ অকূল!’
ঝিঙে ফুল ॥
তুমি বলো- 'আমি হায়
ভালোবাসি মাটি-মা'য়,
চাই না ও অলকায়-
ভালো এই পথ-ভুল!'
ঝিঙে ফুল ॥
প্রতিটি ভাষায়ই এমন কিছু বাক্য রয়েছে, যেগুলোতে লুকিয়ে আছে গভীর ভাব। কবি, সাহিত্যিক, মনীষীদের রচনা কিংবা হাজার বছর ধরে প্রচলিত প্রবাদ প্রবচনে নিহিত থাকে জীবনসত্য। এ-ধরনের গভীর ভাব বিশ্লেষণ করে তা সহজভাবে বুঝিয়ে দেওয়াকে বলে ভাবসম্প্রসারণ। ভাবসম্প্রসারণে যুক্তি, দৃষ্টান্ত ও প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি দিয়ে মূলভাব পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে হবে। ভাবসম্প্রসারণ লেখার সময় নিচের বিষয়গুলো লক্ষ রাখতে হবে:
১. উদ্ধৃত অংশটি মনোযোগ দিয়ে বারবার পড়ে এর মূলভাব উদ্ধার করতে হবে। লেখার উদ্ধৃত অংশটির মধ্যে এমন কিছু শব্দ থাকে যার অর্থ বুঝতে পারলে মূলভাব বোঝা সহজ হয়। তাই প্রতিটি শব্দের অর্থ খুঁজে বুঝতে হবে।
২. মূলভাব সহজ ও সরল ভাষায় বর্ণনা করতে হবে। একই বিষয় বারবার লেখা যাবে না। অবান্তর কথা লেখা যাবে না। উদ্ধৃত অংশে কোনো উপমা বা রূপক থাকলে তার অর্থ বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিতে হবে।
৩. মূলভাব স্পষ্ট করার জন্য উদাহরণ, উদ্ধৃতি ইত্যাদি দেওয়া যাবে। উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে লেখকের নাম দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
৪. ভাবসম্প্রসারণের আয়তন প্রবন্ধের মতো বড় বা সারাংশের মতো ছোট হবে না।
নিচে ভাবসম্প্রসারণের কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো।
১. চরিত্র মানবজীবনের অমূল্য সম্পদ।
ভাবসম্প্রসারণ: মানবজীবনে চরিত্র মুকুটস্বরূপ। চরিত্রবান ব্যক্তিকে সবাই শ্রদ্ধা করে। চরিত্রহীনকে সকলে ঘৃণা করে। চরিত্রহীন ব্যক্তির মানুষ হিসেবে কোনো মূল্য নেই।
চারিত্রিক গুণাবলির মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনের মহিমা প্রকাশ পায়। চরিত্রবান ব্যক্তি কতগুলো গুণের অধিকারী হন। সৎ, বিনয়ী, উদার, নম্র, ভদ্র, রুচিশীল, ন্যায়পরায়ণ, সত্যবাদী, নির্লোভ, পরোপকারী ইত্যাদি গুণ চরিত্রবান ব্যক্তিকে মহত্ত্ব দান করে। এসব গুণ যদি মানুষের মধ্যে না থাকে, তাহলে সে পশুরও অধম বলে বিবেচিত হয়। চরিত্রবান ব্যক্তি তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের গুণে সমাজে ও জীবনে শ্রদ্ধাভাজন ও সমাদৃত হন। অন্যদিকে চরিত্রহীন ব্যক্তিকে কেউ ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখে না, বরং ঘৃণা করে। চরিত্রবান ব্যক্তি জাগতিক মায়া-মোহ-লোভ-লালসার বন্ধনকে ছিন্ন করে লাভ করেন অপরিসীম শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত সম্মান।
অর্থ-বিত্ত-গাড়ি-বাড়ি প্রভৃতির চেয়ে চরিত্র অনেক বড় সম্পদ। আর এ-মর্যাদা অর্থমূল্যে নয়, মানবিক ও নৈতিক পবিত্রতার মানদণ্ডে বিচার করতে হয়। সকলেরই উচিত চরিত্রবান হওয়ার সাধনা করা।
২. পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি।
ভাবসম্প্রসারণ: সৌভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে কোনো মানুষের জন্ম হয় না। মানুষ কর্মের মাধ্যমে তার ভাগ্য গড়ে তোলে। পরিশ্রমই সৌভাগ্য বয়ে আনে। উদ্যম, চেষ্টা ও শ্রমের সমষ্টিই সৌভাগ্য।
যিনি জন্ম দান করেন তিনি প্রসূতি। মা যেমন সন্তানের প্রসূতি, তেমনি কঠোর পরিশ্রম হলো সৌভাগ্যের প্রসূতি বা উৎস। মানুষকে তার কর্মফল ভোগ করতে হয়। ভালো কাজের ফল ভালো, মন্দ কাজের ফল মন্দ। কোনো কাজই আবার সহজ নয়। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কঠিন কাজও সহজ হয়। জীবনে উন্নতি করতে হলে পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। পরিশ্রম ছাড়া কেউ কখনো তার ভাগ্যকে গড়ে তুলতে পারেনি। জীবনে অর্থ, বিদ্যা, যশ, প্রতিপত্তি লাভ করতে হলে অবশ্যই পরিশ্রম করতে হবে। ছাত্রজীবনে কঠোর পরিশ্রম করে শিক্ষালাভ না করলে সাফল্য লাভ সম্ভব নয়। পরিশ্রম ছাড়া জাতীয় উন্নতিও লাভ করা যায় না।
শ্রমই হলো উন্নতির চাবিকাঠি। যে-জাতি পৃথিবীতে যত বেশি পরিশ্রমী, সে-জাতি তত উন্নত। ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত পরিশ্রমের মধ্য দিয়েই জাতীয় সৌভাগ্য অর্জন করা যায়।
৩. শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।
ভাবসম্প্রসারণ: শিক্ষাই আলো, নিরক্ষরতা অন্ধকার। শিক্ষা মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়, মানুষের অন্তরের প্রতিভাকে জাগিয়ে তোলে। শিক্ষাহীন মানুষ আর অন্ধের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যে-জাতি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত সে-জাতি পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকে।
জীবন ছাড়া শরীর মূল্যহীন, শিক্ষা ছাড়া জীবনের কোনো মূল্য নেই। নিরক্ষর জনগোষ্ঠী জাতির জন্য বোঝাস্বরূপ। মাঝিবিহীন নৌকা চলতে পারে না, মেরুদণ্ডহীন মানুষও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তেমনি শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি সফল হয় না। যে-দেশের লোক যত বেশি শিক্ষিত, সে-দেশ তত বেশি উন্নত। জাতীয় জীবনে উন্নতি ও প্রতিষ্ঠা নির্ভর করে শিক্ষার উপর। মানুষের পূর্ণ বিকাশের জন্যই শিক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষা শুধু ব্যক্তিজীবনে উন্নতি বয়ে আনে না, সমাজ জাতি ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সব রকম উন্নতিও সাধন করে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশ আজ নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
উন্নতির একমাত্র চাবিকাঠি শিক্ষা। শিক্ষা ব্যক্তি ও জাতির ভবিষ্যৎ কল্যাণ বয়ে আনে। তাই জাতিকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা একান্ত জরুরি।
৪. ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।
ভাবসম্প্রসারণ: জীবন কর্মময়। কর্মশক্তির মূলে রয়েছে উৎসাহ-উদ্দীপনা আর প্রবল আগ্রহ। আগ্রহের সঙ্গে নিষ্ঠা থাকলে অসাধ্যকে সাধন করা যায়।
মানুষকে সব বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করে ইচ্ছাশক্তি। প্রতিদিনই আমাদের কোনো-না-কোনো কাজ করতে হয়। পৃথিবীতে কোনো কাজই বিনা বাধায় করা যায় না। সব কাজেই কিছু-না-কিছু সুবিধা-অসুবিধা ও বাধা-বিপত্তি থাকে। সেই অসুবিধা ও বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে পারলেই সাফল্য আসে। এজন্য প্রয়োজন প্রবল ইচ্ছা শক্তি। ইচ্ছা থাকলে কোনো কাজ আটকে থাকে না। ইচ্ছাই মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়। ইচ্ছাই সকল কর্মের প্রেরণা। দৃঢ় ইচ্ছার কাছে সকল বাধা হার মানে। প্রবল ইচ্ছা নিয়ে কোনো কাজ করলে অতি কঠিন কাজও শেষ করা যায়। পৃথিবীর মহান ব্যক্তিরা এভাবেই সব ধরনের বিপত্তি অতিক্রম করে লক্ষ্যে পৌঁছেছেন। সম্রাট নেপোলিয়ান তাঁর সেনাবাহিনীসহ আল্পস পর্বতের কাছে গিয়ে অসীম উৎসাহে বলে ওঠেন: 'আমার বিজয় অভিযানের মুখে আল্পস পর্বত থাকবে না।' আত্মশক্তি ও ইচ্ছাশক্তির বলে তিনি আল্পস পার হতে পেরেছিলেন।
মানুষের সকল কাজের মূল হলো ইচ্ছাশক্তি। ইচ্ছাই মানুষকে সাফল্যের দ্বারে পৌঁছে দেয়।
১. আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।
ভাবসম্প্রসারণ: মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে পরস্পর সহযোগিতার মাধ্যমে তাকে বেঁচে থাকতে হয়।
সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষের জীবন অর্থহীন। কারণ, সমাজে প্রতিটি মানুষ একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। যে ব্যক্তি কেবল নিজের কথা ভাবে, সমাজের কথা ভাবে না, সে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক। সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষ কখনোই সুখী হয় না। যারা নিজেদের কথা না ভেবে সমাজের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য জীবনকে বিলিয়ে দেয়, তারাই প্রকৃত মানুষ। অন্যের সুখের জন্য যারা ত্যাগ স্বীকার করে, তাদের মতো সুখী আর কেউ নেই। সমাজে এরকম মানুষেরাই চিরস্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন।
একে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসাই প্রকৃত মানবধর্ম। আজকের এই সভ্যতা গড়ে ওঠার পেছনে কাজ করেছে মানুষের শুভবুদ্ধি ও অন্যের কল্যাণ করার ইচ্ছা। ত্যাগের মাঝেই জীবনের সার্থকতা নিহিত, ভোগের মাঝে নয়।
২. স্বদেশের উপকারে নাই যার মন
কে বলে মানুষ তারে পশু সেই জন।
ভাবসম্প্রসারণ: নিজের দেশকে ভালোবাসার মতো মহান আর কিছু নেই। দেশ মানুষকে আশ্রয় দেয়, অন্ন দেয়, স্বাধীনতা দেয়।
যার নিজের কোনো দেশ নেই, তার মতো দুঃখী আর কেউ নেই। স্বদেশের উপকার করা প্রত্যেকটি নাগরিকেরই কর্তব্য। দেশের কল্যাণ করা মানে নিজের কল্যাণ করা। ইতিহাসে দেখা যায়, স্বদেশকে শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করতে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। কারণ তাঁরা জানতেন, একটি স্বাধীন দেশের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই। অন্যদিকে যারা দেশকে কিছু দিতে চায় না বা পারে না, তারা মানুষ হিসেবে ব্যর্থ। হিংস্র পশু যেমন ক্ষুধা নিবারণের জন্য নিজের সন্তানকেও খেয়ে ফেলতে পারে, তেমনি তারা স্বার্থ রক্ষার জন্য নিজের দেশকে বিক্রি করে দিতে পারে। এ ধরনের লোকদের সকলেই ঘৃণা করে। তারা কারো কাছে সম্মান পায় না। তারা এক অর্থে পশুর চেয়ে অধম।
স্বদেশের কল্যাণ চিন্তা করাই প্রকৃত মানুষের ধর্ম। স্বদেশপ্রীতি যার নেই সে পশুর সমান। এ-ধরনের মানুষ ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
৩. বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
ভাবসম্প্রসারণ: আজকের এই সভ্যতা বিকাশে নারী ও পুরুষের সমান অবদান রয়েছে। নারী ও পুরুষ তাই সমান মর্যাদার অধিকারী।
কেবল পুরুষ কিংবা কেবল নারী থাকলে এ-পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাকত না। অনেকে ভুল ধারণা পোষণ করেন, ভাবেন পুরুষ নারীর চেয়ে শক্তিশালী, সভ্যতার বিকাশে কেবল পুরুষের অবদান রয়েছে। অথচ নারীর অবদান পুরুষের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। সভ্যতার আদিতে কৃষিকাজ আবিষ্কার করেছে নারী। পুরুষ বাইরের কাজ করলে ঘরের কাজ করেছে নারী। বর্তমানে নারী-পুরুষ উভয়েই ঘরে-বাইরে সমান তালে কাজ করে যাচ্ছে। তবুও নারীদের আমরা পুরুষের সমান মর্যাদা দিতে চাই না। আমরা ভুলে যাই যে, নারী ও পুরুষ একই বৃন্তের দুটি ফুল। একটি ছাড়া আরেকটি অচল। নারীর অবদান ও মর্যাদাকে অস্বীকার করা অন্যায়। আমাদের উচিত নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদা দেওয়া এবং একসঙ্গে কাজ করা। এভাবেই দেশ ও জাতির প্রকৃত উন্নয়ন সাধিত হবে।
এই পৃথিবীর উন্নতির পিছনে নারী ও পুরুষের ভূমিকা সমান। তাই নারীকেও পুরুষের সমান মর্যাদার আসনে বসাতে হবে।
৪. নানান দেশের নানান ভাষা
বিনা স্বদেশী ভাষা মিটে কি আশা?
ভাবসম্প্রসারণ: মাতৃভাষার চেয়ে মধুর ভাষা পৃথিবীতে আর নেই। মায়ের ভাষায় যত সহজে ও সাবলীলভাবে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়, অন্য ভাষায় তা সম্ভব নয়।
প্রতিটি মানুষই মাতৃভাষায় কথা বলতে আনন্দবোধ করে। স্বদেশি ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলে মনের পিপাসা ততটা মেটে না। জীবনের প্রয়োজনে মানুষকে বিদেশি ভাষা শিখতে হয়। কিন্তু বিদেশি ভাষায় মনের সকল ভাব প্রকাশ করা অসম্ভব। মনের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য তাকে বারবার মাতৃভাষার কাছে ফিরে আসতে হয়। মানুষ তার মাতৃভাষায় চিন্তা করে, স্বপ্ন দেখে। অন্য ভাষা যতই মর্যাদাশীল হোক না কেন, মাতৃভাষার সঙ্গে তার কিছুতেই তুলনা চলে না। বাংলা ভাষার শক্তিমান কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রথম জীবনে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ভুল বুঝতে পেরে তিনি মাতৃভাষা বাংলায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেন এবং খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন, মাতৃভাষাতেই তা বলতে পেরেছেন।
মাতৃভাষাকে ভালোবাসা আমাদের সকলের দায়িত্ব। অন্যথায় আমরা আমাদের পরিচয় হারিয়ে ফেলব। ভাষা ধ্বংস হলে একটি জাতি ধ্বংস হয়ে যায়। তাই বাঙালি জাতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে মাতৃভাষা বাংলাকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে।
১। ভাবসম্প্রসারণ কর:
ক) কর্ম মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
খ) চকচক করলেই সোনা হয় না।
আমাদের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম পত্র বা চিঠি। দূরের মানুষের সাথে চিঠিপত্রের মাধ্যমে সহজে ও স্বল্প খরচে মনের ভাব আদান-প্রদান করা যায়। বড়দের মতো ছোটরাও পত্র লিখতে পারে। পত্রের মাধ্যমে বন্ধুদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা যায়। তা ছাড়া বিদ্যালয়ে বিভিন্ন কারণে প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদনপত্র লিখতে হয়। এজন্য চিঠিপত্র লেখার নিয়মকানুন জানা দরকার।
পত্র লেখার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। আমাদের সেসব নিয়ম জানতে হবে। সচরাচার যেসব পত্র লিখতে হয় সেগুলোকে দুভাগে ভাগ করা যায়- (ক) ব্যক্তিগত পত্র ও (খ) আবেদনপত্র বা দরখাস্ত। নিচে এগুলোর পরিচয় দেওয়া হলো।
ক) ব্যক্তিগত পত্র: মা-বাবা, ভাই-বোন, বন্ধুবান্ধবকে ব্যক্তিগত দরকারে যেসব পত্র লেখা হয়, সেগুলো ব্যক্তিগত পত্র।
খ) আবেদনপত্র বা দরখাস্ত : বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে কিংবা বিশেষ প্রয়োজনে সরকারের বিভিন্ন অফিস ও সংস্থা অথবা বেসরকারি কোনো সংস্থার কর্মকর্তাদের নিকট যেসব পত্র লেখা হয় সেগুলোকে আবেদনপত্র বা দরখাস্ত বলা হয়।
ব্যক্তিগত পত্র লেখার নিয়ম:
এজাতীয় পত্রের দুটো অংশ থাকে- (ক) বাইরের অংশ বা শিরোনাম ও (খ) ভেতরের অংশ বা পত্রগর্ভ।
ক) শিরোনাম: পত্রের খাম বা পোস্টকার্ডে প্রেরক (যিনি চিঠি লেখেন) ও প্রাপকের (যাঁর উদ্দেশে চিঠি লেখা হয়) তাঁর নাম ও ঠিকানা লেখা হয়। একে শিরোনাম বলে। পোস্টকার্ড বা খামের বাম দিকে থাকে প্রেরকের নাম ও ঠিকানা আর ডানদিকে থাকে প্রাপকের নাম ও ঠিকানা।

খ) পত্রগর্ভ : একটি পত্রের বিষয় অনুসারে কয়েকটি ভাগ থাকে। যেমন-
১. পত্রের উপরের ডানদিকে প্রেরকের ঠিকানা লিখতে হয়। ঠিকানার নিচে পত্র লেখার তারিখ লিখতে হয়।
২. পত্রের বাম দিকে প্রাপকের প্রতি সম্ভাষণ থাকে। বয়স ও সম্পর্ক অনুযায়ী সম্ভাষণের ভাষায় পার্থক্য থাকে। গুরুজনদের উদ্দেশে শ্রদ্ধেয়, শ্রদ্ধাভাজনীয়ায়ু ইত্যাদি লেখা হয়। সমবয়সী বন্ধুদের প্রতি প্রিয়, প্রীতিভাজনেষু, প্রীতিভাজনায়ু, বন্ধুবরেষু ইত্যাদি লেখা হয়।
৩. এরপর আসে পত্রের মূল বক্তব্য। এ-অংশে বক্তব্য অনুযায়ী কয়েকটি অনুচ্ছেদে পত্রটিকে বিভক্ত করতে হয়। বক্তব্যের শুরুতে কুশল জিজ্ঞাসা এবং শেষে সুস্বাস্থ্য কামনা করতে হয়।
৪। বক্তব্যের শেষে সমাপ্তিসূচক শব্দ, যেমন- ইতি, শুভেচ্ছান্তে, সালামান্তে ইত্যাদি লিখতে হয়। তারপর পত্র প্রেরকের নাম লিখতে হয়। অনেকে পত্রের উপরে, ঠিক মাঝখানে মঙ্গলসূচক বাক্য লিখে থাকেন। এতে পত্রলেখকের ধর্মবিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটে। যেমন- এলাহি ভরসা, ৭৮৬, শ্রীহরি শরণম্, ওঁ ইত্যাদি।
১) পরীক্ষার ফলাফলের সংবাদ জানিয়ে বাবার কাছে একখানা পত্র লেখ।
ঢাকা
জানুয়ারি ১৫, ২০১৮
শ্রদ্ধেয় বাবা,
সালাম নিন। আশা করি ভালো আছেন। গতকাল আপনার চিঠি পেলাম। আপনার আসতে দেরি হবে জেনে মনটা বেশ খারাপ হলো।
আজ আমার বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। আমার ফল জেনে আশা করি আপনি খুশি হবেন।
এবারও আমি আমার জায়গাটি ধরে রাখতে পেরেছি। আমি A+ পেয়েছি। দোয়া করবেন, আমি যেন আপনার মুখ উজ্জ্বল করতে পারি।
আপনাকে অনেক দিন দেখিনি। আপনাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। ছুটি নিয়ে এক দিনের জন্য হলেও আমাদের সঙ্গে দেখা করে যান। আমরা আপনার আগমনের অপেক্ষায় রইলাম।
বাড়ির সবাই ভালো আছেন। আপনি শরীরের প্রতি যত্ন নেবেন। ভালো থাকবেন।
ইতি
আপনার স্নেহের
অর্ক।

২। তোমার বোনের বিয়ে উপলক্ষে বন্ধুর কাছে আমন্ত্রণপত্র লেখ।
রাজশাহী
ডিসম্বের ১৫, ২০১৭
প্রিয় অরিক,
আমার ভালোবাসা নিও। আশা করি তোমরা সবাই ভালো আছ। শুনে খুশি হবে, আগামী ১লা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ আমার বড় বোনের বিয়ে। বিয়েতে অনেক ধুমধাম হবে। তোমার কথা বার বার মনে পড়ছে। তুমি এলে খুব মজা হবে।
বাবা- মাসহ বাড়ির সবাই তোমাকে ভীষণভাবে মনে করেন। বিয়ের অন্তত এক সপ্তাহ আগে তুমি আমাদের বাড়ি চলে আসবে। তুমি না এলে বিয়ের মজাই পাওয়া যাবে না। শুধু তমি নও, তোমাদের বাড়ির সবাইকে নিয়ে চলে আসবে। মনে থাকে যেন।
বড়দের আমার সালাম দিও, ছোটদের দিও আদর।
ভালো থেকো।
ইতি
তোমার বন্ধু
শুভ।

১. বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির জন্য প্রধান শিক্ষকের কাছে ছুটির দরখাস্ত।
ফেব্রুয়ারি ০১, ২০১৮
প্রধান শিক্ষক
তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
ঢাকা।
বিষয়: অনুপস্থিতি জনিত ছুটি মুঞ্জুরের আবেদন।
জনাব,
সবিনয় নিবেদন এই যে, সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় গত ২৯/০১/২০১৮ থেকে ৩১/০১/২০১৮ পর্যন্ত তিন দিন আমি বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতে পারিনি।
অতএব, আমাকে উক্ত তিন দিনের ছুটি মঞ্জুর করার জন্য আপনাকে অনুরোধ জানাচ্ছি।
বিনীত,
আপনার একান্ত অনুগত ছাত্রী
অনন্যা সরকার
ষষ্ঠ শ্রেণি, ক শাখা
রোল নম্বর ৫
২. বিনা বেতনে পড়ার সুযোগলাভের জন্য প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদন।
জানুয়ারি ২৬, ২০১৮
প্রধান শিক্ষক
বিএইচপি একাডেমি
বরিশাল।
বিষয়: বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগদান প্রসঙ্গে।
জনাব,
সবিনয় নিবেদন এই যে, আমি আপনার বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। আমার বাবা একটি বেসরকারি অফিসের স্বল্প বেতনের কর্মচারী। আমরা চার ভাইবোন। আমার বড় দুই ভাই কলেজে ও ছোট বোন স্কুলে লেখাপড়া করে। পরিবারের ভরণপোষণের পর আমাদের লেখাপাড়ার খরচ চালানো আমার বাবার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য যে, আমি কৃতিত্বের সঙ্গে পঞ্চম শ্রেণি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছি। আমি নিয়মিত ক্লাস করি।
অতএব, আমাদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে আমাকে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ দিলে আমার পড়াশোনা নির্বিঘ্ন হবে এবং তাতে আমার পরিবারও বিশেষভাবে উপকৃত হবে।
বিনীত,
মোঃ আশরাফুল ইসলাম
শ্রেণি: ষষ্ঠ
শাখা: ক
রোল নম্বর: ০৩
৩। বড় বোনের বিয়ে উপলক্ষে প্রধান শিক্ষকের কাছে অগ্রিম ছুটির আবেদন।
জানুয়ারি ২৫, ২০১৮
প্রধান শিক্ষক
ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
চট্টগ্রাম।
বিষয়: বড় বোনের বিয়ে উপলক্ষে অগ্রিম ছুটি মঞ্জুরের আবেদন।
জনাব,
বিনীত নিবেদন এই যে, আগামী ২রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ আমার বড় বোনের বিয়ে। উক্ত অনুষ্ঠানের বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে। এ-কারণে আগামী ৩১ জানুয়ারি থেকে ০৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমার পক্ষে বিদ্যালয়ে আসা সম্ভব নয়।
অতএব, আমাকে উক্ত পাঁচ দিনের ছুটি দেওয়ার জন্য আপনাকে অনুরোধ জানাচ্ছি।
বিনীত,
রুবি আক্তার
শ্রেণি: ষষ্ঠ
রোল নম্বর: ১১
১। পত্র লেখ:
ক) বাবার কাছে টাকা চেয়ে পত্র লেখ।
খ) দর্শনীয় স্থানের বর্ণনা দিয়ে বন্ধুর কাছে চিঠি লেখ।
বাক্য মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম। কিন্তু সব সময় একটি বাক্যের মাধ্যমে মনের সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। প্রয়োজন হয় একাধিক বাক্যের। মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করার জন্য পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত বাক্যের সমষ্টিই অনুচ্ছেদ।
অনুচ্ছেদ এবং প্রবন্ধ এক বিষয় নয়। কোনো বিষয়ের সকল দিক আলোচনা করতে হয় প্রবন্ধে। কোনো বিষয়ের একটি দিকের আলোচনা করা হয় এবং একটিমাত্র ভাব প্রকাশ পায় অনুচ্ছেদে। অনুচ্ছেদ রচনার কয়েকটি নিয়ম রয়েছে। যেমন-
ক) একটি অনুচ্ছেদের মধ্যে একটিমাত্র ভাব প্রকাশ করতে হবে। অতিরিক্ত কোনো কথা লেখা যাবে না।
খ) সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো বাক্যের মাধ্যমে বিষয় ও ভাব প্রকাশ করতে হবে।
গ) অনুচ্ছেদটি খুব বেশি বড় করা যাবে না।
ঘ) একই কথার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
ঙ) যে বিষয়ে অনুচ্ছেদটি রচনা করা হবে, তার গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সহজ-সরল ভাষায় সুন্দরভাবে তুলে ধরতে হবে।
মানুষ ভাবতে ভালোবাসে। মানুষের মনে যেসব ভাবনা খেলা করে সেসবের শিল্পময় প্রকাশই ছবি। কে কখন ছবি আঁকা শুরু করেছিল তা বলা মুশকিল। তবে মানুষের আঁকা সবচেয়ে পুরোনো ছবির কথা জানা যায়। ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে স্পেনে আলতামিরা নামক এক গুহায় প্রথম মানুষের আঁকা ছবির সন্ধান মেলে। যেকোনো মানুষই ছবি আঁকে। এমন কোনো মানুষ নেই যে জীবনে কোনোদিন ছবি আঁকেনি। যে-কোনো ছবি, হতে পারে তা কোনো পশু, পাখি, মাছ, আম, জাম, কাঁঠাল, পেঁপে- এর কোনো-না-কোনোটি মানুষ জীবনে একবার হলেও এঁকেছে। আঁকতে আঁকতে অনেকের ছবি আঁকাটাই নেশা হয়ে যায় এবং জীবনে ছবি আঁকা ছাড়া তারা আর কিছু ভাবতে পারে না। ছবি আঁকা নিয়েই তাদের স্বপ্ন, ছবি-আঁকাই তাদের পেশা হয়ে যায়। তারা নিজেদের প্রতিভার প্রকাশ ঘটায় ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে। পৃথিবীতে অনেকে বিখ্যাত হয়েছেন শুধু ছবি এঁকে।
রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে নানা ধরনের সামগ্রী বিক্রি করে বা ফেরি করে যে জীবিকা নির্বাহ করে, সে-ই ফেরিওয়ালা। ফেরিওয়ালা আমাদের নিত্যদিনের পরিচিত ব্যক্তি। প্রতিদিনই আমরা দেখি তারা মহল্লায় মহল্লায়, রাস্তায় রাস্তায় বিভিন্ন ধরনের জিনিস, মাছ, তরকারি, ফল, খাবার, কাপড়চোপড় বিক্রি করে। তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আমাদের বাসার সামনে হাজির হয়। বাজারের চেয়ে কম দামে তাদের কাছ থেকে এসব কেনা যায়। অনেক সময় নানা ধরনের গান গেয়ে তারা ক্রেতার মন জয় করার চেষ্টা করে। অনেক ফেরিওয়ালা আবার চুড়ি, ফিতাসহ নানা ধরনের খেলনা বিক্রি করে। যাওয়া-আসার মধ্য দিয়ে অনেক ফেরিওয়ালা অনেক পরিবারের সঙ্গে আন্তরিকতার সম্পর্ক গড়ে তোলে। তারা আমাদের চাহিদা মতো অনেক জিনিস দূরের শহর থেকেও এনে দেয়। এভাবে তারা আমাদের সময় ও শ্রম বাঁচায়।
সমাজে যে যে-কাজই করুক না কেন, কোনো কাজকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। সকল কাজই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ফেরিওয়ালাদের সম্মান দেখানো আমাদের মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। শীতকাল তার মধ্যে অন্যতম। শীতকালে নতুন ধান ওঠে। সেই ধানে ঘরে ঘরে পিঠা বানানোর উৎসব শুরু হয়। নতুন চালের গুড়ো আর খেজুর রসের গুড় দিয়ে বানানো হয় নানা রকম পিঠা। নানান তাদের নাম, নানান তাদের রূপের বাহার। ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পুলি পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা, আরও হরেক রকম পিঠা তৈরি হয় বাংলার ঘরে-ঘরে। পায়েস, ক্ষীর ইত্যাদি মুখরোচক খাবার আমাদের রসনাকে তৃপ্ত করে শীতকালে। এ-সময় শহর থেকে অনেকে গ্রামে যায় পিঠা খেতে। তখন গ্রামাঞ্চলের বাড়িগুলো নতুন অতিথিদের আগমনে মুখরিত হয়ে ওঠে। শীতের সকালে চুলোর পাশে বসে গরম গরম ভাপা পিঠা খাওয়ার মজাই আলাদা। গ্রামের মতো শহরে শীতের পিঠা সেরকম তৈরি হয় না। তবে শহরের রাস্তাঘাটে শীতকালে ভাপা ও চিতই পিঠা বানিয়ে বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া অনেক বড় বড় হোটেলে পিঠা উৎসব হয়। শীতের পিঠা বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান।
সকালবেলা আমার খুবই প্রিয় একটা সময়। আমি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে আমার বাড়ির পাশে নদীর তীরে হাঁটতে যাই। সেখান থেকে সকালের সূর্যোদয় খুবই সুন্দর লাগে। সকালের শীতল বাতাস আমার দেহমন জুড়িয়ে দেয়। নানারকম পাখির কলকাকলিতে পরিবেশটা মুখরিত হয়ে ওঠে। এ-সময় কৃষকেরা গরু নিয়ে হাল চাষ করতে বের হয়। গ্রামের মসজিদে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে সমস্বরে কোরান তেলাওয়াত করে। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে আমি বাড়ি ফিরে নাস্তা করে পড়তে বসি। তারপর বন্ধুদের সাথে মিলে স্কুলে যাই। ছুটির দিনে সকালবেলা আমি বাবাকে নানা কাজে সাহায্য করি। সকাল-বেলা তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠলে আমার সারাটা দিন খুব ভালো কাটে।
আমার ঘরের সামনে একটি পায়ে-হাঁটা রাস্তা আছে। ঘর থেকেই রাস্তাটি দেখা যায়। রাস্তাটি শুরু হয়েছে পাশের গ্রাম থেকে। একটি বড় রাস্তার সঙ্গে গিয়ে এটি মিশেছে। সারাদিনই এ-রাস্তা দিয়ে মানুষ যাওয়া-আসা করে। কত রকমের মানুষ যে এ-রাস্তা দিয়ে চলাচল করে তার হিসেব নেই। অফিসের কর্মচারী, কৃষক, ছাত্রছাত্রী, দিনমজুর, ফেরিওয়ালা প্রভৃতি পেশার মানুষ সকালবেলা তাদের কর্মক্ষেত্রে যায় এ-রাস্তা দিয়ে। কাজশেষে বিকেলে আবার ফিরে আসে তাদের বাড়িতে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি সবার আনাগোনা। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা- একেক ঋতুতে রাস্তাটি একেক রূপ ধারণ করে। পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলোয় রাস্তাটি অপরূপ লাগে। তখন মনে হয় রাস্তাটি যেন চলে গেছে কোন অজানা দেশে। আমার জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এ-রাস্তা।
প্রবন্ধ হলো প্রকৃষ্টরূপে বন্ধনযুক্ত রচনা। অর্থাৎ অন্যান্য রচনা, যেমন- কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদির সঙ্গে প্রবন্ধ লেখার রীতি ও কৌশলের পার্থক্য রয়েছে। কবির একান্ত অনুভূতিই কবিতায় প্রকাশ পায়। গল্প হলো মানবজীবনের নির্বাচিত ঘটনার আখ্যান বা কাহিনি। উপন্যাসের পরিসর বড়। সেখানে লেখক গল্পকারের তুলনায় বেশি স্বাধীন। উপন্যাসে সমগ্র জীবন ফুটে ওঠে। নাটকে কেবলই থাকে সংলাপ। বিবরণ বা বর্ণনার সেখানে তেমন স্থান নেই। কিন্তু প্রবন্ধকে হতে হয় যুক্তি ও তথ্যনির্ভর। কাদের জন্য প্রবন্ধ লেখা হচ্ছে সেটা মনে রাখতে হয়। কোন বিষয়ে প্রবন্ধ লেখা হচ্ছে তাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রবন্ধ-রচয়িতার মেধা, জ্ঞান, প্রকাশক্ষমতা প্রবন্ধের গুণগত মান বাড়িয়ে দেয়। প্রবন্ধের ভাষা স্থির করা হয় প্রবন্ধের বিষয় অনুসারে। বিজ্ঞানের কোনো বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে গেলে তাতে বিজ্ঞানের পরিভাষা ব্যবহার করতে হবে। সকল বয়সের পাঠকের জন্য একই ভাষায় প্রবন্ধ লেখা যায় না। শিশুরা যে-ভাষা বুঝবে, তাদের জন্য প্রবন্ধ সেভাবে লিখতে হবে। বিষয় অনুসারে প্রবন্ধের শ্রেণিবিভাগ করা হয়। বিজ্ঞানের বিষয়কে আশ্রয় করে রচিত প্রবন্ধকে আমরা বলি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ। সমাজের সমস্যা, সংকট, অবস্থা যেসব প্রবন্ধের মূল বিষয়, সেগুলোকে বলা হয় সামাজিক প্রবন্ধ। সাহিত্যকর্মের গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে যেসব প্রবন্ধ রচিত হয়, সেগুলোকে বলে সমালোচনামূলক প্রবন্ধ। লেখকের অনুভূতিই যখন প্রবন্ধের আকারে তুলে ধরা হয়, তখন তাকে বলে অনুভূতিনির্ভর প্রবন্ধ। এ ছাড়াও প্রবন্ধের আরও শ্রেণি নির্দেশ করা যায়।
প্রবন্ধ-রচনার কৌশল
প্রবন্ধের প্রধানত তিনটি অংশ থাকে- (ক) ভূমিকা (খ) মূল অংশ (গ) উপসংহার।
ক) ভূমিকা: যে-বিষয়ে প্রবন্ধ লেখা হয় সে-বিষয়ে শুরুতেই সংক্ষেপে প্রথম অনুচ্ছেদে একটি ধারণা দেওয়া হয়। এটিই হলো ভূমিকা। এ-অংশ হতে হবে বিষয় অনুযায়ী, আকর্ষণীয় ও সংক্ষিপ্ত।
খ) মূল অংশ: প্রবন্ধের মধ্যভাগ হলো মূল অংশ। এখানে প্রবন্ধের মূল বক্তব্য পরিবেশিত হয়। বিষয় অনুসারে এ অংশ বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বিভক্ত হতে পারে। প্রতিটি অনুচ্ছেদ যেন মূল প্রবন্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এ-অংশে কোনো উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হলে তা যাতে কোনোভাবেই বিকৃত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে অর্থাৎ মূল রচনায়, যেভাবে আছে সেভাবেই তা ব্যবহার করতে হবে।
গ) উপসংহার: অল্প কথায় সমাপ্তিসূচক ভাব প্রকাশ করাই উপসংহার। ব্যক্তিগত মত, সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশা এ-অংশে প্রকাশ করা যেতে পারে।
প্রবন্ধ-রচনায় দক্ষতা অর্জনের উপায়
প্রবন্ধ-রচনায় দক্ষতা অর্জন একদিনে হয় না। কিন্তু তা সাধ্যের অতীত কোনো বিষয় নয়। এজন্য করণীয় হলো-
১. প্রবন্ধের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করা।
২.দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রবন্ধ পড়া। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ, সংবাদ, প্রতিবেদন, ভাষণ ইত্যাদি নিয়মিত পাঠ করলে নানা প্রসঙ্গে বিষয়গত ধারণা লাভ করা যায়।
৩. প্রবন্ধের বক্তব্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তুলে ধরতে হবে।
৪. প্রবন্ধ-রচনার ভাষা হবে সহজ ও সরল।
৫. প্রবন্ধে কোনো অপ্রয়োজনীয় বিষয় থাকবে না এবং একই কথার পুনরাবৃত্তি ঘটানো যাবে না।
৬. প্রবন্ধে উদ্ধৃতি, উক্তি বা প্রবাদ-প্রবচন ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু এসবের ব্যবহার যেন অতিরিক্ত পর্যায়ে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
৭.প্রবন্ধ যাতে অতিরিক্ত দীর্ঘ না হয় তা লক্ষ করতে হবে।
ভূমিকা
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আর শিক্ষালাভের জন্য চাই আদর্শ বিদ্যাপীঠ। এক সময় শিক্ষা ছিল আশ্রমকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থী সেই সময় আশ্রমে থেকেই গুরুর কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করত। আদর্শ বিদ্যালয় এক-একটি আশ্রমবিশেষ। এমনই একটি আশ্রম আমার বিদ্যালয়। এ-বিদ্যালয়ের নাম স্বপ্নিল উচ্চ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
প্রতিষ্ঠা
স্বপ্নিল উচ্চ-মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত। তৃতীয় থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এ-বিদ্যালয়ে পাঠদান করা হয়। বিদ্যালয়টি ঢাকা বোর্ডের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে বেশ কয়েক বার স্বীকৃতি লাভ করেছে।

অবস্থান
ঢাকা মহানগরীর কেন্দ্রবিন্দুতে, জাতীয় সংসদ ভবনের পশ্চিম পাশে মনোরম পরিবেশে আমাদের বিদ্যালয় অবস্থিত। এর উত্তর পাশে একটি ব্যস্ত রাস্তা। বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার জন্য ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। মহানগরীর যেকোনো এলাকা থেকে বিদ্যালয়ে সহজেই আসা যায়।
বিদ্যালয়ের পরিবেশ
বিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের গাছ রয়েছে। বিশাল প্রাঙ্গণে দুটি দীর্ঘকায় চারতলা ভবন। তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত তিনটি করে শাখা এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে সাতটি করে শাখা রয়েছে। প্রতি শাখার জন্যই রয়েছে আলাদা ও পরিপাটি শ্রেণিকক্ষ। অধ্যক্ষ ও দুজন উপাধ্যক্ষের নিজস্ব মনোরম কক্ষ রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন অংশে বিভক্ত একটি বড় অফিসরুম আছে। নব্বই জন শিক্ষকের জন্য রয়েছে তিনটি সুন্দর কক্ষ। একটি বড় পাঠাগার আছে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের বই রয়েছে। বিদ্যালয় ভবনের সামনে আছে বিশাল মাঠ।
শিক্ষার্থী
আমাদের বিদ্যালয়ে প্রতিটি শ্রেণিতে তিনটি করে শাখা। প্রতি শাখায় পঞ্চান্ন জন করে শিক্ষার্থী। তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থীসংখ্যা তেরশো পঞ্চাশ এবং কলেজ শাখার শিক্ষার্থীসংখ্যা এক হাজার চারশো। সকালে সব শিক্ষার্থী যখন জাতীয় সংগীত পরিবেশনের জন্য একসঙ্গে দাঁড়াই, তখন মনে হয় এ যেন শিক্ষার্থীদের এক বিশাল মিলনমেলা।
শিক্ষক
আমাদের অধ্যক্ষ একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। আমাদের দুজন উপাধ্যক্ষ আছেন। প্রিয় শিক্ষকবৃন্দ আমাদের সন্তানের মতো স্নেহ করেন এবং আলোকিত মানুষ হবার শিক্ষা দেন। আমরা তাঁদের গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি।
লেখাপড়ার পদ্ধতি
সপ্তায় ছয় দিন আমাদের বিদ্যালয় খোলা থাকে। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। প্রতিদিন আমাদের ছয়টি ক্লাস হয়। প্রতি সপ্তাহে রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার, আগের সপ্তাহে পড়ানো হয়েছে এমন সব বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হয়। এ ছাড়াও বছরে তিনটি পরীক্ষা হয়। সাপ্তাহিক ও টেস্টের ৪০% এবং ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক ও বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ফল তৈরি করা হয়। পরীক্ষার কারণে আমাদের পড়ালেখার টেবিল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপায় থাকে না।
গবেষণাগার
বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, জীববিজ্ঞান গবেষণাগার এবং কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে ।
পাঠ্যক্রম-অতিরিক্ত বিষয়ের চর্চা
আমাদের বিদ্যালয়ে কতগুলো ক্লাব আছে। যেমন- নাট্যদল, সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিতর্ক ক্লাব, দাবা ক্লাব, সায়েন্স ক্লাব, সংগীতদল, পাঠচক্র ও শরীরচর্চা ক্লাব।
অনুষ্ঠানাদি
ক্লাবগুলো সারা বছর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের আয়োজন করে থাকে। এসব অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ আসেন। তাঁদের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ যেমন আমরা পাই, তেমনি তাঁদের কাছ থেকে নতুন নতুন তথ্য জানতে পারি।
খেলাধুলা
আমাদের বিদ্যালয়ের খেলার মাঠটি অনেক বড়। মাঠে নিয়মিত খেলাধুলা হয়। প্রতিদিন বিকেলে মৌসুম অনুযায়ী ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, বাস্কেটবল, হ্যান্ডবল ও ব্যাডমিন্টন খেলা হয়। আমাদের বিদ্যালয়ে ফুটবল, ক্রিকেট ও বাস্কেটবল টিম আছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে আমরা অনেক পুরস্কার অর্জন করেছি।
পরীক্ষার ফল
প্রতিবছরই আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন করে। পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল সবার দৃষ্টি কাড়ে। মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষায় আমাদের বিদ্যালয় প্রতিবছরই সেরা দশে থাকে।
নিজস্ব বৈশিষ্ট্য
পরীক্ষার ভালো ফল এবং ক্লাবের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য আমাদের বিদ্যালয়ের সুনাম রয়েছে। আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষাপদ্ধতি ও নিয়ম-শৃঙ্খলা অন্য সব প্রতিষ্ঠান থেকে উন্নত।
উপসংহার
একটি আদর্শ বিদ্যালয় বলতে যা বোঝায়, আমাদের বিদ্যালয় তা-ই। মনোরম পরিবেশ, জ্ঞানী-গুণী শিক্ষক আর সেরা ফলাফলের জন্য আমাদের বিদ্যালয় অতুলনীয়। এ-প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী হতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। আমাদের বিদ্যালয় সব সময় দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক- এই আমার প্রত্যাশা।
ভূমিকা
বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় ও অভিজাত খেলা ক্রিকেট। ক্রিকেটকে খেলার রাজাও বলা হয়। রেকর্ড ভাঙা এবং রেকর্ড গড়ার খেলা ক্রিকেট। ক্রিকেট নিয়ে সমগ্র বিশ্বে এখন উত্তেজনা। ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা প্রতিদিন বাড়ছে। আমার প্রিয় খেলা ক্রিকেট।

ক্রিকেটের জন্ম
কবে প্রথম ক্রিকেট খেলা শুরু হয়, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে মনে করা হয়, ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে ইংল্যান্ডে ক্রিকেট খেলা আরম্ভ হয়। হ্যাম্পসায়ারের অন্তর্গত হ্যাম্পারডন নামক স্থানে প্রথম ক্রিকেট দল গড়ে ওঠে। পরে তা সমগ্র ব্রিটেন এবং সকল ব্রিটিশ উপনিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশসহ অনেক দেশে ক্রিকেট খেলা জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
প্রকারভেদ
ক্রিকেট খেলা দু-ধরনের। একটি হলো ওয়ান ডে ম্যাচ বা এক দিনের খেলা, অন্যটি টেস্ট ম্যাচ বা পাঁচ দিনের খেলা। এখন আবার শুরু হয়েছে টুয়েন্টি টুয়েন্টি ম্যাচ। বিশ্বে বিখ্যাত টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্ত দেশগুলো হলো ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে ও বাংলাদেশ।
উপকরণ
ক্রিকেট খেলার মুখ্য উপকরণ কাঠের ব্যাট ও বল। ব্যাট দৈর্ঘ্যে আড়াই ফুট ও প্রস্থে সাড়ে চার ইঞ্চি হয়। এ খেলায় প্রায় সাড়ে তিন ইঞ্চি ব্যাসবিশিষ্ট চামড়ায় মোড়ানো কাঠের বল ব্যবহার করা হয়। খেলার জন্য কাঠের তৈরি তিনটি দণ্ড প্রয়োজন হয়। এগুলোকে উইকেট বলে। বিপরীত দিকে একইভাবে আরও তিনটি উইকেট থাকে। উইকেটের মধ্যে ব্যবধান সমান রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট মাপের দু-টুকরো কাঠ উইকেটের উপর বসানো হয়। একে বেল বলে। এ ছাড়া পায়ে পরার জন্য তুলার তৈরি এক প্রকার পুরু প্যাড ও হাতে পরার জন্য গ্ল্যাভস বা হাতমোজা প্রয়োজন পড়ে।
মাঠের আকৃতি
ক্রিকেট মাঠ বৃত্তাকার। সাধারণত এর ব্যাসার্ধ হয় ৭০ গজ। মাঠের মাঝখানে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয় পিচ। পিচের দৈর্ঘ্য হয় ২২ গজ।
নিয়ম-কানুন
দুটি দলের মধ্যে ক্রিকেট খেলা হয়। প্রতি দলে এগারো জন করে খেলোয়াড় থাকে। ক্রিকেট খেলা পরিচালনার জন্য দুইজন আম্পায়ার থাকেন। ক্ষেত্রবিশেষে তৃতীয় আম্পায়ার দেখা যায়।
খেলা আরম্ভের পূর্বে দুজন আম্পায়ার এবং দু-দলের দুজন অধিনায়ক মাঠে নামেন। মুদ্রা ছুড়ে দিয়ে টসের মাধ্যমে এক দল জয়ী হয়। টসে জয়লাভকারী অধিনায়ক ইচ্ছে করলে ব্যাটিং বা ফিল্ডিং যেকোনোটি বেছে নিতে পারেন। উভয় দলকে একবার করে ব্যাট করতে হয়। ফিল্ডিংকারী দলের সমস্ত খেলোয়াড় মাঠের ভেতর অধিনায়কের নির্দেশ মেনে তাদের নিজস্ব স্থানে অবস্থান করেন। যে-দল প্রথম ব্যাটিং করবে, সে দলের দুজন খেলোয়াড় ব্যাট হাতে দু উইকেটে গিয়ে দাঁড়ান। তাঁদের মধ্যে একজন বল পেটান, অপরজন প্রয়োজনবোধে রান সংগ্রহ করার জন্য দৌড়ান। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা ব্যাটসম্যানদের আউট করার চেষ্টা করেন। বল নিক্ষেপকারীকে বোলার বলে। একজন বোলার পরপর ছটি বল করতে পারেন। ছটি বলে এক ওভার ধরা হয়। ব্যাটসম্যান অতি সতর্কতার সাথে বল মারেন। সুযোগমতো বল ব্যাটের আঘাতে দূরে পাঠান।
ব্যাটসম্যান যখন বল দূরে পাঠান, তখন অপর দিকের উইকেটে অপেক্ষমাণ খেলোয়াড় ও ব্যাটসম্যান একে অন্যের পাশে দৌড়ে এলে এক রান হয়। বল গড়িয়ে সীমারেখা পার হলে চার রান হয়। আর বল না গড়িয়ে মাঠের উপর দিয়ে সীমানা অতিক্রম করলে ছয় রান হয়।
বল যদি উইকেটে লাগে, তাহলে ব্যাটসম্যান আউট হন। একে বোল্ড আউট বলে। ব্যাট দিয়ে আঘাত করার পর তা মাটিতে পড়ার আগেই বিপক্ষ দলের খেলোয়াড় ধরে ফেললে ব্যাটসম্যান আউট হন। একে কট আউট বলে। এ ছাড়া ব্যাটসম্যান রান আউট বা স্টাম্প আউটও হতে পারেন। এক দলের সবাই আউট হয়ে গেলে বা নির্ধারিত ওভার শেষ হয়ে গেলে অন্য দল ব্যাটিং করতে নামে।
ক্রিকেট খেলার জয়পরাজয় নির্ধারিত হয় রানের সংখ্যা বা নির্দিষ্ট সময়ে কতজন ব্যাটসম্যান নট আউট থেকে যায়, তা হিসেব করে। এ-খেলায় যে-দল রান, ওভার, সময় ও উইকেটরক্ষায় সক্ষম হয়, সে-দলই জয়লাভ করে।
ক্রিকেট খেলার আনন্দ
ক্রিকেট খেলার চমক ভিন্ন মাত্রার। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য সাজানোর মতো মাঠে ফিল্ডার সাজানো খুবই কৌশলের ব্যাপার। ক্রিকেটের উত্তেজনা বেড়ে যায় যখন, ব্যাটসম্যানের নৈপুণ্যে সেই ব্যূহ তছনছ হয়ে যায় ছক্কা ও চারের মারে। ছক্কা ও চারের মারে রান তোলার উত্তেজনাই আলাদা। বোলিংয়ের দাপট বা ফিল্ডারদের হাতে ব্যাটিং-বিপর্যয় এই উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনাকে চরমে পৌঁছে দেয়। একদিনের ক্রিকেটের উত্তেজনা আলাদা। বর্তমানে টি-টুয়েন্টি (২০ ওভার) ম্যাচ সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ খেলা হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
উপকারিতা
অন্যান্য খেলার মতো ক্রিকেট খেলা ও আনন্দদায়ক ও স্বাস্থ্যকর। এ-খেলা একাধারে খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলাবোধ, পারস্পরিক সমঝোতা, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, দায়িত্বজ্ঞান ও সতর্কতার শিক্ষা দেয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। দেশের ক্রীড়াদলকে শুভেচ্ছাদূত বলে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলোয়াড়গণ এ-খেলায় পারদর্শী হয়ে উঠছেন। বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।
সতর্কতা
ক্রিকেট খেলায় যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। কাঠের বল বেশ শক্ত। বোলারের সজোরে নিক্ষেপ করা বল কোনো খেলোয়াড়ের শরীরে লাগলে সে মারাত্মকভাবে আহত হতে পারে, মাথায় লাগলে অনেক সময় মৃত্যুর কারণও হয়ে দাঁড়ায়। তাই যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে ক্রিকেট খেলা উচিত। ক্রিকেট খেলা অত্যন্ত সময়হরণকারী, এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি হয়। তা ছাড়া ক্রিকেট বেশ ব্যয়বহুল খেলা। সবকিছুরই ভালো-মন্দ দুটি দিক থাকে। ক্রিকেটের ভালো দিকই বেশি। মন্দ যে দিকগুলোর কথা বলা হলো, সেদিকে আমরা সচেতন থাকব।
উপসংহার
আধুনিক যুগে যত খেলা রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিকেট। ক্রিকেট খেলা যেমন আনন্দদায়ক, তেমনি ব্যয়সাপেক্ষ ও সময়সাপেক্ষ। সময় ও অর্থের অধিক ব্যয়ের কারণে অনেক সমালোচক একে অপচয় বলে মনে করেন। তবু বিশ্ব আজ ক্রিকেটজ্বরে আক্রান্ত। এর জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া।
বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ঋতুগুলোর মধ্যে বর্ষাকাল একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। আষাঢ় ও শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল। তবে ভাদ্র মাসের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে বর্ষা থাকে। গ্রীষ্মের পরে আসে বর্ষা। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে প্রকৃতি যখন জ্বলেপুড়ে যেতে থাকে, তখন শান্তির পরশ নিয়ে আসে বর্ষাকাল। দিনরাত অবিরাম বৃষ্টির ধারা প্রকৃতিকে করে তোলে শান্ত ও মনোরম। আকাশে সারাদিন চলে মেঘ ও সূর্যের লুকোচুরি খেলা। মেঘের গুডুগুডু ধ্বনি মনকে দোলায়িত করে। আকাশে যখন বিদ্যুৎ চমকায়, মেঘের গর্জন ও বিদ্যুতের চমকে শিহরিত হয় শরীর ও মন। বৃষ্টির পানিতে নদী-নালা-খাল-বিল টইটম্বুর হয়ে যায়। নতুন পানি পেয়ে ব্যাঙ ডাকতে থাকে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ। তখন সবার মন কেমন উদাস হয়ে যায়।

বর্ষাকালে প্রকৃতি নবজীবন লাভ করে। গাছপালার রং গাঢ় সবুজ হয়ে ওঠে। প্রকৃতি শীতল হয়ে যায়। বর্ষার নতুন পানিতে মাছেরাও প্রাণ ফিরে পায়। অধিক বৃষ্টিপাত হলে রাস্তাঘাট ডুবে যায়। তখন গ্রামগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো পানিতে ভেসে থাকে। নৌকা ছাড়া তখন চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে কৃষিজমি নরম হয়ে যায়। এ-সময় জমি চাষ করা খুবই সহজ। কৃষকেরা মনের আনন্দে জমি চাষ করে তাতে ধান, পাট রোপণ করে। বর্ষা যত বাড়তে থাকে গ্রামের লোকের কাজ তত কমতে থাকে। এ-সময় তারা অলস জীবনযাপন করে। পুরুষেরা ঘরের দাওয়ায় বসে ঘরের টুকটাক কাজ করে, আড্ডা দেয়। মাঝে মাঝে বসে গানের আসর। মহিলারা ঘরে বসে নকশি কাঁথা সেলাই করে।
শহরে বর্ষাকাল বেশিরভাগ সময়ে ভোগান্তির সৃষ্টি করে। একটু বেশি বৃষ্টি হলেই শহরের রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যায়। এ-সময় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে সমস্যা হয়। দিনমজুরেরা বর্ষাকালে কর্মহীন হয়ে পড়ে।
বর্ষাকালে উজান থেকে বয়ে আসা পানিতে কৃষিজমি উর্বর হয়। বর্ষার পানিতে ময়লা আবর্জনা ধুয়ে যায়। ফলে পরিবেশ-দূষণ কমে। এ-সময় নদীতে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের পানির চাহিদার ৭০ ভাগ পূরণ হয় বর্ষাকালে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জলপথে যাতায়াত সহজ হয়। এ-সময় মাছেরা বংশবৃদ্ধি করে। বর্ষাকালে জাম, পেয়ারা, জামরুল, আনারস ইত্যাদি ফল পাওয়া যায়। গাছে-গাছে জুঁই, কেয়া, কদম ইত্যাদি ফুল ফোটে। তাই কবির ভাষায় বলতে হয় :
গুডুগুডু ডাকে দেয়া
ফুটিয়ে কদম-কেয়া
ময়ূর পেখম খুলে
সুখে তান ধরছে।
বর্ষাকালের যেমন উপকারিতা আছে, তেমনি ক্ষতিকর দিকও আছে। অধিক বৃষ্টিপাত ও হিমালয় থেকে আসা ঢলে অনেক সময়েই বন্যা হয়। তখন জনপদের পর জনপদ পানিতে ডুবে যায়। ভাসিয়ে নিয়ে যায় খেতের ফসল, ঘরবাড়ি, গবাদি পশু। লাখ লাখ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করে। এ-সময় জ্বর, ডায়রিয়া, আমাশয় ইত্যাদি রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। এতে অনেক লোকের প্রাণহানি ঘটে। বন্যার পানিতে শহরের রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে যায়। ফলে যানবাহন প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয়। বন্যায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস হয়।
নানারকম অসুবিধার সৃষ্টি করলেও বর্ষাকাল আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়েই আসে। কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে আমাদের অর্থনীতিতে বর্ষাকাল বিরাট অবদান রাখে। বর্ষা আছে বলেই বাংলাদেশে সবুজের এত সমারোহ। তাই বৈশাখে আমরা যেমন বর্ষবরণ করি, তেমনি বর্ষাকালে ঘটা করে বর্ষাবরণ করি। বাংলা সাহিত্যেও বর্ষাকাল বিপুলভাবে অভিনন্দিত।
নদীর কথা উঠলে একটি নদীই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তার নাম শীতলক্ষ্যা। শীতলক্ষ্যা আমার প্রিয় নদী। আমাদের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জে, ঠিক শীতলক্ষ্যা নদীর পাশেই। শীতলক্ষ্যা আমার জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। শীতলক্ষ্যা নদীর রূপ একেক ঋতুতে একেক রকম।
গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড উত্তাপে যখন পানি শুকিয়ে যায়, তখন নদীর দুই পাশে জেগে ওঠে চর। সেখানে কৃষকেরা আলু, মরিচ, পেঁয়াজ ইত্যাদি চাষ করে। আমরা সকালে গরু-ছাগল চরাতে নিয়ে যাই সেই চরে। দুপুরবেলা নদীতে দাপাদাপি করে গোসল করি। চরের বালিতে শুয়ে বিশ্রাম নিই, আবার ঝাঁপিয়ে পড়ি নদীতে। যারা বয়সে একটু বড়, তারা বাজি ধরে সাঁতরে নদী পার হয়। আমরা হাততালি দিয়ে তাদের উৎসাহ দিই। নদীর বুক চিরে যখন বড় বড় জাহাজ চলে যায়, আমরা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকি। মায়ের মুখে শুনেছি, এ-ন দীতে এক সময় কুমির ছিল। কিন্তু এখন আর কুমির দেখা যায় না, তবে মাঝে মাঝে শুশুক ভেসে উঠেই আবার ডুব দেয়।

বর্ষাকালে শীতলক্ষ্যা নদী কানায় কানায় ভরে যায়। এ-সময় নদীতে প্রচণ্ড স্রোত থাকে। বড় বড় ঢেউ তীরে এসে আঘাত করে। অনেক সময় নদীর পানি বেশি বেড়ে গেলে দুই পাশের গ্রাম, ফসলের মাঠ সব ডুবে যায়। তখন আমাদেরকে হয় ঘরের চালে, অথবা নৌকায় আশ্রয় নিতে হয়। এ-সময় নদীর রূপ দেখলে আমার ভয় করে। তবে বাবা প্রায়ই ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে খুব সহজে চলে যায় দূরদূরান্তে। আমরা বাড়িতে ঢুকে-পড়া পানিতে সাঁতার কেটে গোসল করি।
শরৎকালে শীতলক্ষ্যা আবার অন্য রূপ ধরে। তখন নদীর দুই পাশে যত দূর চোখ যায়, কাশফুল ফুটে থাকে। কাশবনের ভেতরে অনেক পাখি বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে। আমরা বিকেল বেলা নৌকায় চড়ে নদীর বুকে নেমে পড়ি। সন্ধ্যাবেলা যখন পাখিরা বাসায় ফিরে আসে, তখন তাদের কলকাকলিতে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে। আমরা নৌকার পাটাতনে শুয়ে সন্ধ্যার আকাশ দেখি। সে এক অপরূপ দৃশ্য! রাতে কাশবনে শেয়াল ডাকে- হুক্কা হুয়া করে।
শীতকালে অনেক বেলা পর্যন্ত শীতলক্ষ্যার বুকে কুয়াশা জমে থাকে। এ-সময় নদীটাকে অনেক রহস্যময় লাগে। এ-সময় নদীতে চর জাগা শুরু হয়। আমরা খাড়ি পেরিয়ে চরে চলে যাই মাছ ধরতে। সন্ধ্যা হতে-না-হতেই নদীটি আবার কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে।
শীতলক্ষ্যা নদী বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ-নদীতেই রয়েছে বাংলাদেশের প্রধান নদীবন্দর। নদীর পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কলকারখানা। অনেক বড় বড় জাহাজ চলে যায় নদী দিয়ে। তবে শীতলক্ষ্যা নদী দিন দিন দূষিত হয়ে যাচ্ছে, যা আমাকে খুবই কষ্ট দেয়।
শীতলক্ষ্যাকে কেন্দ্র করেই এর দুই তীরের মানুষের জীবন গড়ে উঠেছে। আমি এই নদীকে ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করতে পারি না। শীতলক্ষ্যা যেন আমার জীবনেরই অংশ।
সত্যবাদিতা একটি মহৎ গুণ। একজন সত্যবাদী মানুষ কখনো মিথ্যা বলেন না। চরম বিপদেও তিনি সত্যকে আঁকড়ে থাকেন। সত্যবাদী সমাজে ও রাষ্ট্রে আদর্শ মানুষ হিসেবে বিবেচিত। তাঁকে সবাই সম্মান করে।
সত্য কথা বলার গুণকে সত্যবাদিতা বলে। সত্যবাদিতা মানুষের চরিত্রের অলংকারস্বরূপ। সত্য কথা বলতে পারলে অন্যান্য গুণ মানুষের মধ্যে এমনিই চলে আসে। সত্য কথা বললে হয়তো সাময়িক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু এর পরিণাম সবসময়ই ভালো হয়। সত্যবাদী মানুষ কখনো খারাপ কাজ করতে পারেন না। তিনি খুবই নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসী হন। সবাই তাঁকে বিশ্বাস করে ও ভালোবাসে। একজন মিথ্যাবাদীও সত্যবাদীকে পছন্দ করে। পক্ষান্তরে মিথ্যাবাদীকে কেউ পছন্দ করে না। সে সমাজে সবার কাছে হেয় হয়। কেউ তাকে সম্মান করে না। প্রবাদ আছে যে, মিথ্যাবাদীর সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো, সবাই তাকে অবিশ্বাস করে তা নয়, বরং সে-ই কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না।
ইতিহাসে যারা স্মরণীয় হয়ে, আছেন তাঁদের সবাই ছিলেন সত্যবাদী। মহানবি হজরত মুহম্মদ (সা.) ছিলেন সত্যবাদিতার আদর্শস্বরূপ। তাঁকে সবাই আল-আমিন বা বিশ্বাসী বলে ডাকত। তাঁর শত্রুরাও তাঁকে বিশ্বাস করত। তাঁর কাছে তাদের সম্পত্তি গচ্ছিত রেখে যেত। মহাত্মা গান্ধী একদিন তাঁর বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করেন। কিন্তু পরে তিনি অনুশোচনায় বিদ্ধ হয়ে বাবাকে তাঁর চুরির কথা বলে দেন। এতে তাঁর বাবা তাঁর উপর খুবই রাগ করেন। কিন্তু গান্ধী তাতেও সত্যের পথ থেকে সরে আসেননি। তিনি সারাজীবন যা সত্য বলে জেনেছেন, তা-ই পালন করেছেন। কখনোই মিথ্যার কাছে মাথা নত করেননি।
অল্প বয়স থেকেই সত্যবাদিতার চর্চা করতে হয়। কোনো ভুল বা দোষ করলে তা স্বীকার করার মনোবল আমাদের অর্জন করতে হবে এবং পরবর্তীতে আর তা না-করার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সত্যবাদিতার জয় সুনিশ্চিত। মিথ্যা কথা বলে অন্যায় সুবিধা পাওয়ার চেয়ে সত্য কথা বলে কষ্ট স্বীকার করা অনেক ভালো। সত্যবাদিতা শেখার প্রথম পাঠশালা হলো পরিবার। পরিবারে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে, শিশুরা যাতে কখনো মিথ্যা কথা না শেখে। তাদের সামনে সত্যবাদিতার আদর্শ স্থাপন করতে হবে।
সত্যবাদিতা মানুষের চরিত্রকে সুন্দর ও মহৎ করে তোলে। আমাদের সবাইকে সত্যবাদিতার চর্চা করতে হবে। আমরা মনে রাখব সত্যের জয় হবেই। মিথ্যা বললে সাময়িক সুবিধা হয়তো পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তার পরিণতি হয় ভয়ংকর। একজন সত্যবাদী পৃথিবীর অমূল্য সম্পদ।
ভূমিকা
মাতৃভূমি মানুষের কাছে স্বর্গবিশেষ। আমার গ্রাম আমার কাছে স্বর্গ। আমার জন্ম গ্রামে। আমার গ্রামের চেয়ে পবিত্র আর কিছু নেই। যেখানে আমার জন্ম, সেই গ্রামের জল আমার তৃষ্ণা মিটিয়েছে, খেতের ফসল ক্ষুধা দূর করেছে, পাখির কলকাকলি আমার ঘুম ভাঙিয়েছে, মুক্ত বাতাস আমার প্রাণ জড়ানো আমার গ্রাম। কবির ভাষায়:
আমাদের গ্রামখানি ছবির মতন,
মাটির তলায় এর ছড়ানো রতন।
নাম ও অবস্থান
আমার গ্রামের নাম রূপনগর। গ্রামের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট খাল। পূর্ব পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নদী; যদিও নদীটি গাঁয়ের মানুষের কাছে বড় খাল নামে পরিচিত। ফরিদপুর জেলায় ছায়াময় মায়াময় এ-গ্রাম। নদীটি পূর্ব-পশ্চিমে দু-মাইল লম্বা ও উত্তর-দক্ষিণে দেড় মাইল প্রশস্ত।

লোকসংখ্যা
আমাদের গ্রামে প্রায় তিন হাজার লোক বাস করে। এ-গ্রামে সকল ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে। সবার মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন অটুট।
পোশাক-পরিচ্ছদ
আমাদের গ্রামের মানুষ ভালো কাপড়চোপড় পরে। পুরুষেরা লুঙ্গি, পাজামা, পাঞ্জাবি, শার্ট এবং মেয়েরা সালোয়ার, কামিজ, শাড়ি পরে।
পেশা
আমাদের গ্রামের প্রায় প্রতি বাড়িতে উচ্চশিক্ষিত লোক রয়েছে। তাঁরা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চপদে কর্মরত আছেন। বাংলাদেশের বাইরেও অনেকে কর্মরত। যাঁরা গ্রামে বসবাস করেন, তাঁদের কেউ কৃষক, কেউ-বা ব্যবসায়ী। এ ছাড়া নানান পেশার লোক রয়েছে আমাদের গ্রামে। তাঁদের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উকিল, তাঁতি, জেলে, কামার, কুমার, সুতোর।
ঘরবাড়ি
আমাদের গ্রামের বেশির ভাগ ঘরবাড়ি টিনের তৈরি। তবে বারোটি দালানও রয়েছে। কোনো কোনো বাড়ি ছনের বা খড়ের তৈরি।
উৎপন্ন দ্রব্য
গ্রামের প্রধান ফসল ধান। আমাদের গ্রামে প্রচুর ধান হয়। এ ছাড়াও উৎপন্ন হয় পাট, গম, ডাল, সরিষা, তিল, আখ এবং নানারকম শাকসবজি। প্রচুর পরিমাণে গাভীর দুধ পাওয়া যায়। পুকুর, খাল ও নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। সব বাড়িতেই হাঁস-মুরগি পালন করা হয়। বাগানে আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, পেয়ারা, নারকেল, জাম, সুপারি, তাল, বেল, হরীতকী, আমলকী ইত্যাদি পাওয়া যায়। গ্রামের মানুষের নিজেদের খাবারের জন্য যা প্রয়োজন, তার প্রায় সবই গ্রামে উৎপন্ন হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
আমাদের গ্রামে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জীবনের প্রথম পাঠ শুরু করে। প্রাথমিক পাঠ শেষ করে ভর্তি হয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। আমাদের গ্রামে একটি স্বেচ্ছাসেবক নৈশ বিদ্যালয় আছে। যারা লেখাপড়া জানেন না, গ্রামের শিক্ষিত যুবকেরা তাদের সন্ধ্যার পর লেখাপড়া শেখান। আমাদের গ্রামে কোনো নিরক্ষর লোক নেই।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান
আমাদের গ্রামে যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তেমনি রয়েছে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও। যেমন- পোস্ট অফিস, দাতব্য চিকিৎসালয়, কৃষি অফিস।
হাটবাজার ও দোকানপাট
আমাদের গ্রামে একটি বড় হাট আছে। সপ্তায় দুইদিন সেখানে হাট বসে। হাটবার হলো: শনিবার ও বুধবার। হাটের দিন অনেক দূর থেকে বহু ক্রেতা-বিক্রেতা আসে। হাটে ধান, চাল, আলু, বেগুন, পটল, পাট, হাঁস, মুরগি ইত্যাদি প্রায় সবধরনের জিনিসপত্র বেচাকেনা হয়। গ্রামে প্রতিদিন সকালে বাজার বসে। মাছ, দুধ, শাকসবজিসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় প্রায় সব জিনিস এখানে পাওয়া যায়।
ব্যবস্থা
গ্রামের পূর্ব পাশ দিয়ে নদী বয়ে চলেছে। গ্রামের তিন পাশে রাস্তা রয়েছে। দক্ষিণের রাস্তায় গাড়ি চলে। উঁচু বাঁধের উপর দিয়ে রিকশা, ভ্যান চলে। যখন গ্রামে পানি ওঠে, তখন রাস্তা থাকার কারণে লোকজনের চলাচলে কোনো সমস্যা হয় না। সব রাস্তায় রিকশা-ভ্যান চললেও গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ হেঁটে চলাচল করে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য
প্রকৃতি যেন তার আপন খেয়ালে আমাদের গ্রামটি সাজিয়েছে। যেদিকেই তাকানো হোক না কেন, সেদিকেই সবুজ আর সবুজ। আম, জাম, কাঁঠাল, জামরুল, বাতাবি, বেল, কুল, পেয়ারা, কদম, শিরিশ কড়ই, চাম্বল, মেহগনি, শিশুকাঠসহ নানারকমের গাছ গ্রামকে ছায়াময় করে তুলেছে। মাঠভরা শস্যখেতের উপর দিয়ে যখন বাতাস বয়, মনে হয় যেন সবুজ সমুদ্রে ঢেউ উঠেছে।
সামাজিক অবস্থা
অর্থনৈতিক দিক থেকে আমাদের গ্রাম সচ্ছল। গ্রামের সবাই স্বনির্ভর বলে চুরি-ডাকাতি খুন-খারাবির কোনো বালাই নেই। গ্রামের শতভাগ লোকের অক্ষরজ্ঞান থাকায় কোনো রকমের কুসংস্কারও নেই।
উপসংহার
সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা আমাদের গ্রাম। এমন গ্রামে জন্ম নিয়ে ধন্য আমি। আমাদের গ্রামের সকল প্রকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আমি এগিয়ে যাব। কুপ্রভাব থেকে গ্রামকে মুক্ত রাখব। আমরা সবাই মিলে গ্রামের ঐতিহ্য বজায় রাখব- এ আমার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।
আমি বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। স্কুলের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি আমি অনেক বই পড়ে থাকি। আমার আব্বা-আম্মা আমাকে প্রায়ই নতুন নতুন বই উপহার দেন। একদিন আব্বা আমার জন্য একটি বই নিয়ে আসেন। বইটির নাম দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। বইয়ের নাম 'আম আঁটির ভেঁপু'। গল্পের বইয়ের নাম এমন হতে পারে, আমি কখনোই ভাবিনি। আমি আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'আব্বা, আম আঁটির ভেঁপু কী?' আব্বা বললেন, 'আমের আঁটি থেকে একরকম বাঁশি বানানো যায়, তাকে ভেঁপু বলে।' আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, 'আম আঁটির ভেঁপুর সঙ্গে গল্পটির সম্পর্ক কী?' তিনি বললেন, 'পড়ে দেখো, বুঝতে পারবে।'
আমি বইটি হাতে নিয়ে উৎসাহের সঙ্গে দেখতে লাগলাম। বইটির লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রচ্ছদে একটি মেয়ে একটি ছেলের হাত ধরে খোলা মাঠ ধরে দৌড়ে যাচ্ছে। বাতাসে মেয়েটির চুল উড়ছে। ছেলেটির হাতে একটি বাঁশি। আমি বইটি পড়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ি। সামনে গ্রীষ্মের ছুটি, তাই পড়ালেখার তেমন চাপ ছিল না। আমি বইটি নিয়ে পড়তে বসি।

'আম আঁটির ভেঁপু' এক কিশোরী ও তার ছোট ভাইয়ের গল্প। মেয়েটির নাম দুর্গা ও ছেলেটির নাম অপু। তারা নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের প্রান্তে ভাঙা বাড়িতে বাস করে। তাদের বাবা হরিহর মানুষের বাড়িতে পূজা করে যা আয় করে, তা-ই দিয়ে সংসার চালায়। মা সর্বজয়া। তাদের সাথে আরও থাকেন এক বৃদ্ধ পিসি। এই নিয়ে তাদের সংসার। বাবার আয়ে তাদের সংসার ভালোভাবে চলে না, অভাব অনটন লেগেই থাকে। কিন্তু তাদের মধ্যে ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। 'আম আঁটির ভেঁপু' একটি দরিদ্র কিন্তু ভালোবাসাময় পরিবারের কাহিনি।
দুর্গা খুবই খেতে ভালোবাসত। কিন্তু চাহিদামতো খাবার দিতে পারত না তার মা-বাবা। তাই সে নানা জায়গা থেকে খাবার নিয়ে খেত।
খাবারের প্রতি আকর্ষণের জন্য দুর্গাকে প্রায়ই মায়ের হাতে উত্তম-মধ্যম খেতে হতো। দুর্গা ছিল খুবই ডানপিটে মেয়ে, তাই মায়ের পিটুনি তার গায়েই লাগত না। সে টোটো করে বনজঙ্গলে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু অপু ছিল লাজুক প্রকৃতির, দুর্গা ছাড়া তার আর কোনো বন্ধু ছিল না। দুর্গা তাকে মারলেও সে দুর্গার পিছে পিছে ঘুরত। দুর্গা অপুকে নানা জায়গা থেকে ফলমূল এনে দিত। এতে অপু খুশি হতো।
একদিন দুর্গাদের গরু হারিয়ে গেলে, অপু আর দুর্গা সেটা খুঁজতে খুঁজতে অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায়। গ্রাম ছেড়ে মাঠ পেরিয়ে তারা চলে যায় রেললাইনের উপরে। এ যেন একটা নতুন দেশ আবিষ্কার। তারা বিদ্যুতের থামে কান পেতে শব্দ শোনে। যখন দূর থেকে তারা ট্রেন আসতে দেখে, তখন দৌড়ে গিয়ে ট্রেনের পাশে দাঁড়ায়। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে ট্রেনের দিকে।
অপুদের এক প্রতিবেশী ধনী। তাদের বাড়ির এক মেয়ের বিয়েতে অপু ও দুর্গা যায় নিমন্ত্রণ খেতে। সেখানে একটি পুঁতির মালা হারিয়ে গেলে সবাই দুর্গাকে দোষারোপ করে এবং তাদের মেরে তাড়িয়ে দেয়। গল্পের এখানটাতেও আমার মনে হলো যেন তাদের সাথে আমিও ছিলাম। আমাকে যেন বিয়েবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমার দুচোখ গড়িয়ে পানি পড়তে লাগল। এমন সময় মা আমাকে দেখে আদর করে জড়িয়ে ধরল। আমি খুবই লজ্জা পেলাম।
অপুর মধ্যে যেন আমি আমাকেই খুঁজে পাই। অপু লাজুক প্রকৃতির হওয়ায় তার কোনো বন্ধু নেই। সে একা একাই বাড়ির পাশের বাগানে ঘুরে বেড়ায়। হাতে লাঠি নিয়ে যোদ্ধা সেজে সে গাছপালার সাথে যুদ্ধ করে। দুর্গা অপুকে মাকাল ফল এনে দিলে অপু যেন সাতরাজার ধন হাতে পায়। কখনো মনে হয়, অপুর সঙ্গে আমিও বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াই। অপু তার বাবার সঙ্গে সন্ধ্যার সময় পড়তে বসে। এ সময় দূর থেকে ভেসে-আসা ট্রেনের শব্দে উদাস হয়ে যায় সে।
বইটি পড়তে পড়তে আমি যেন কোথায় হারিয়ে যাই। অপুর বাবা নতুন কাজের সন্ধানে শহরে যায়। এমন সময়েই ঘটে সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা। দুর্গা ও অপু একদিন বৃষ্টিতে ভেজে। তারপর দুর্গার জ্বর হয় এবং সেই জ্বরে দুর্গা মারা যায়। এতে অপু প্রচণ্ড আঘাত পায়। দুর্গা ছাড়া অপুর পৃথিবী একেবারে ফাঁকা।
অপুর বাবা ফিরে এসে ওদেরকে নিয়ে কাশী চলে যায়। একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য অপুকে ছেড়ে যেতে হয় অতি চেনা, অতি আপন এই ভাঙা বাড়িটি। জিনিসপত্র গোছানোর সময় অপু একটি কৌটায় পুঁতির মালাটি খুঁজে পায়। সে বুঝতে পারে যে, দুর্গাই মালাটি চুরি করে এনে এখানে লুকিয়ে রেখেছিল। অপু মালাটি ফেলে দেয়, যাতে কেউ এটা দেখতে না পায়। এভাবে অপু যেন দুর্গার দোষ পৃথিবীর কাছ থেকে আড়াল করে।
আমি আমার অল্প বয়সে অনেক বই পড়েছি। কিন্তু 'আম আঁটির ভেঁপু' আমার হৃদয়কে যতখানি স্পর্শ করেছে, ততখানি অন্য কোনো বই পারেনি। সারা জীবন এই বইটির কথা আমার মনে থাকবে। আমার প্রিয় বইগুলোর মধ্যে সবার উপরে থাকবে 'আম আঁটির ভেঁপু'।
সূচনা
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সৃষ্টিতে ফুলের অবদান অপরিসীম। অন্যান্য ফুলের মতো শাপলাও সে-সৌন্দর্যের অংশীদার। শাপলা বাংলাদেশের সব অঞ্চলে সহজে পাওয়া যায়। শাপলা ফুলের সৌন্দর্য বাংলাদেশের সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিবেচনায় এবং খুব সহজেই পাওয়া যায় বলে শাপলা জাতীয় ফুলের মর্যাদা পেয়েছে। আমাদের জাতীয় ফুল শাপলার মতো অন্যান্য দেশেও জাতীয় ফুল রয়েছে। যেমন- ভারতের জাতীয় ফুল পদ্ম, ইরানের জাতীয় ফুল গোলাপ ইত্যাদি।
প্রাপ্তিস্থান
শাপলা জলে জন্মে বলেই এটি জলজ ফুল। খালে-বিলে, হাওড়ে-বাঁওড়ে, ঝিলে, পুকুরে, নদীতে, পরিত্যক্ত জলাশয়ে এ-ফুল জন্মে। এ-ফুল চাষাবাদ করতে হয় না। বিনা যত্নেই ফুটে থাকে।
জাতীয় জীবনে ব্যবহার
জাতীয় জীবনে এর অনেক ব্যবহারিক দিক রয়েছে। ডাকটিকিট ও মুদ্রায় শাপলার ছাপচিত্রের ব্যবহার আছে। জাতীয় প্রতীকের মর্যাদাও পেয়েছে এ ফুল।
প্রকারভেদ
রঙের বিবেচনায় শাপলার রয়েছে রকমফের। শাপলা সাদা, লাল, নীল, হলুদ, কালচে লাল, বেগুনি-লাল, রক্ত-বেগুনি, নীল-বেগুনি প্রভৃতি রঙের হয়ে থাকে। বাংলাদেশে সাদা, লাল ও নীল- এই তিন রঙের শাপলা পাওয়া যায়। অন্যান্য রঙের শাপলার তুলনায় সাদা শাপলা বেশি পাওয়া যায়। আমাদের জাতীয় ফুল সাদা শাপলা।

পরিচয়
পানির নিচের মাটি থেকে প্রথমে মূল বা শিকড় গজায়। আর সে-শিকড় থেকে সরু নলের মতো একটি দণ্ড পানি ভেদ করে উপরে উঠে আসে এবং পানির উপরে সে-দণ্ডটি থেকে পাতা বের হয়। পাতা বড় ও পুরু হয়ে পানির উপরে ভাসে। আর মূল থেকে একাধিক শাখা বের হয়, যা দেখতে অনেকটা ঝাড়ের মতো। একাধিক শাখাই মূলত শাপলার নল বা ডাঁটা। এসব নলের মাথায় কলার মোচার আকৃতির ফুলের কুঁড়ি ফোটে। ফুলগুলোও পাতার মতো পানির উপরে ভাসে। শাপলা ফোটে বর্ষাকালে। শাপলা ফুলের মেলায় প্রকৃতিকে অপরূপ সাজে সজ্জিত হতে দেখা যায়।
শাপলা পরিপূর্ণভাবে ফোটার সাথে সাথে পাপড়িগুলো ঝরে পড়ে; আর নলের আগায় গোলাকার বিচিটি পানিতে ডুবে যায়। পানি বাড়ার সাথে সাথে শাপলার বৃদ্ধি ঘটে। আর পানি কমার সাথে সাথে তা নিশ্চিহ্ন হতে থাকে। শীত মৌসুমে খালে-বিলে, নদী-নালায় পানি না থাকার কারণে শাপলা মরে যায়। তবে বিচিগুলো সুপ্ত অবস্থায় থাকে। নতুন বর্ষার আগমনে শাপলাগুলোর শিকড় থেকে আবার চারা গজায়।
সৌন্দর্য
বর্ষার জলে শাপলা ফোটার সাথে সাথে প্রকৃতি ধরা দেয় নবরূপে। শাপলার সৌন্দর্য এমনভাবে ফুটে ওঠে যে প্রকৃতিকে অপরূপ বলে মনে হয়। জ্যোৎস্নারাতে নানা রঙের শাপলা রাতের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে।
উপকারিতা
শাপলা সৌন্দর্য বাড়ায়। শিশু-কিশোররা শাপলা ফুল হাতে নিয়ে আনন্দ উপভোগ করে। তারা শাপলার নল দিয়ে মালা গাঁথে। এর নল বা ডাঁটা তরকারি হিসেবে খাওয়া হয়। শাপলার বিচি থেকে খৈ হয়। তা ছাড়া শাপলা থেকে যে শালুক হয়, তা শুকিয়ে খাওয়া যায়।
উপসংহার
বাংলাদেশের অধিকাংশই জলজ অঞ্চল। বর্ষাকালে তার সম্পূর্ণ রূপ আমরা দেখতে পাই। এ সময় শাপলা জলজ ফুল হিসেবে প্রকৃতির শোভাবর্ধন করে। এর স্বাভাবিক সৌন্দর্য বাঙালির লোকজীবনে, জাতীয় জীবনে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। শাপলা ফুলের তুলনা হয় না।
সূচনা
দৃষ্টিকাড়া ফুল আর অজস্র উপাদেয় ফলে বাংলার প্রকৃতি ভরপুর। প্রকৃতির অসংখ্য ফল ভোজনরসিক বাঙালিকে তুষ্ট করে। এসব ফলের বিচিত্র নাম, ভিন্ন রূপ, নানা স্বাদ ও গন্ধ। গ্রীষ্মের ফল কাঁঠাল। এ-ফল গন্ধ, স্বাদ ও আকৃতিতে বাঙালির অতিপ্রিয়। কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল।
আকার-আকৃতি
জঙ্গল থেকে বাইর অইল এক ব্যাটা
গায়ে তার একশো একটা কাঁটা ॥

প্রচলিত এই ধাঁধাটির অর্থ হলো কাঁঠাল। গায়ে কাঁটার আবরণ নিয়ে কাঁঠাল ফলরাজ্যে নিজের স্বাতন্ত্র্যই ঘোষণা করে। আকৃতিতে এটি অনেক বড়। এক কেজি থেকে বিশ কেজি পর্যন্ত হতে পারে একটি কাঁঠালের ওজন। কাঁচা কাঁঠাল সবুজ বা সবুজাভ হলুদ কিংবা হলদেটে রঙের হয়ে থাকে। কাঁঠাল গাছ এবং ফল দুটোতেই থাকে সাদা দুধের মতো কষ। কাঁঠাল গাছ মাঝারি থেকে বড় হয়ে থাকে। একটি গাছে ধরে অনেক অনেক কাঁঠাল। গাছের গোড়া থেকে শাখা পর্যন্ত কাঁঠাল ফলে।
প্রাপ্তিস্থান
কাঁঠাল বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র পাওয়া গেলেও গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নরসিংদী, ময়মনসিংহ এবং যশোর অঞ্চলে এর ফলন বেশি হয়। মূলত লৌহ-সমৃদ্ধ লাল মাটিতে কাঁঠাল ভালো জন্মে। পাহাড়ি কাঁঠালের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও বান্দরবানের পাহাড়ে বিশেষ আকারের কাঁঠাল জন্মে। স্বাদেও এ-এলাকার কাঁঠাল সমতলভূমির কাঁঠাল থেকে পৃথক। দেশের চাহিদা মিটিয়ে কাঁঠাল আজকাল বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।
ব্যবহার্য অংশ
কাঁঠাল অসংখ্য কোষসমৃদ্ধ হয়ে থাকে। কাঁচা অবস্থায় তা কেটে রান্না করে খাওয়া হয়। কাঁঠালের সব অংশই ব্যবহার করা যায়। কাঁঠালের কোষ এবং বিচি উপাদেয় ও পুষ্টিকর খাবার। এর ছাল গবাদিপশুর খাবার। কাঁঠালের বিচি ভেজে কিংবা রান্না করে খাওয়া যায়।
পাকা কাঁঠালের গন্ধ ও স্বাদ অতুলনীয়। কবির ভাষায়:
কাঁঠাল কণ্টকে ঘেরা ভিতরেতে কোষ,
তার তরে এ ফল কেবা দেয় দোষ।
কাঁঠাল পাকার পর এর মৌ মৌ গন্ধে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে। গাছের চারদিক পাখি বা কীট ছুটে আসে এর আস্বাদ নিতে।
চাষপদ্ধতি
কাঁঠাল উঁচু জমির ফল। যেখানে বৃষ্টির পানি জমে না, সেখানে কাঁঠাল গাছ ভালো জন্মে। বীজ এবং কলমের মাধ্যমে কাঁঠাল গাছের বংশবৃদ্ধি ঘটানো যায়। বীজ থেকে চারা উৎপন্ন করলে এবং সেই চারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে রোপণ করলে উৎপাদন ভালো হয়।
উপসংহার
কাঁঠাল বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল। বাংলাদেশের উঁচু এলাকায় সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে কাঁঠালের উৎপাদন বাড়ানোর প্রতি আমাদের সচেষ্ট হওয়া উচিত। তা ছাড়া কাঁঠালের জুস বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ করে বাজারজাত করা যেতে পারে। এ-বিষয়ে আমাদের জাতীয়ভাবে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
ভূমিকা
আম বাংলাদেশের একটি সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ফল। বাংলাদেশের সব জায়গাতেই আমগাছ দেখতে পাওয়া যায়। আমগাছ আমাদের শুধু ফল দেয় না, এর প্রতিটি অংশ আমাদের কাজে লাগে। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে আমগাছ বিশেষ স্থান দখল করে আছে। আমগাছকে বাংলাদেশের জাতীয় গাছের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

পরিচয়
আমগাছ চিরসবুজ বৃক্ষের অন্তর্গত একটি গাছ। এ-গাছ খুব বড় হয়। এর শাখাপ্রশাখা বিস্তৃত এবং পাতা খুব ঘন। শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়ে আমগাছ ছাতার আকার ধারণ করে। এ-গাছের ছায়ায় বসলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। আমগাছ প্রায় ২০ মিটার পর্যন্ত উঁচু ও ৩০ মিটার প্রশস্ত হতে পারে। আমগাছ দীর্ঘায়ু হয়। একটি আমগাছ একশো বছরের বেশি বেঁচে থাকতে পারে। সাধারণত গাছ লাগানোর চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ফল দেওয়া শুরু করে। আমগাছের খুব বেশি যত্নের দরকার হয় না। যেকোনো জায়গাতেই এটি জন্মাতে পারে।
আমগাছের চাষ
বাংলাদেশে প্রাচীনকাল থেকে আমগাছের চাষ হচ্ছে। গ্রামেগঞ্জে এমন কোনো বাড়ি পাওয়া যাবে না, যেখানে অন্তত একটি আমগাছ নেই। সাধারণত আমের আঁটি থেকে আমগাছ জন্ম নেয়। তবে এ-গাছ থেকে ফল পেতে চার-পাঁচ বছর সময় লেগে যায়। গাছও অনেক বড় হয়। বর্তমানে আমগাছের ডাল থেকে কলম তৈরি করে চাষ হচ্ছে। এ-গাছ আকারে ছোট হয় এবং ফলন হয় তাড়াতাড়ি। বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে কলম আমগাছের চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে অনেক ধরনের আমগাছ রয়েছে। একেক জাতের আমগাছের আকার-আকৃতি একেক রকম। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ফজলি, ল্যাঙড়া, আম্রপালি, খিরশা, গোপালভোগ, কিশানভোগ ইত্যাদি। ফজলি আমের গাছ খুব বড় হয়, অনেকটা বটগাছের মতো ঝুপড়ি হয়ে থাকে। আমগাছে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে মুকুল আসে। তখন চারপাশ মুকুলের গন্ধে ভরপুর হয়ে যায়। বৈশাখ মাসের শুরুতে মুকুল থেকে আম হতে শুরু করে। জ্যৈষ্ঠ মাসে আম পাকে। এক জাতের আম পাকতে পাকতে আষাঢ় মাস চলে আসে। একে আষাঢ়ি আম বলে।
উপকারিতা
আমগাছ শুধু আমাদের ফলই দেয় না, এর কাঠ, পাতা, মূল সবই আমাদের কাজে লাগে। আমগাছের পাতা গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আমগাছের কাঠ দিয়ে ঘরের থাম, দরজা, জানালা, আসবাবপত্র, নৌকা তৈরি হয়। এর সরু ডালপালা ও পাতা শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আম-গাছের ছায়া খুবই শীতল হয়। আমগাছ আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আম গবেষণা কেন্দ্র
বাংলাদেশের রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে আমের ফলন সবচেয়ে ভালো হয়। রাজশাহীতে একটি আম গবেষণা ইনস্টিটিউট রয়েছে। সেখানে উন্নতমানের আমগাছের চারা উৎপাদন ও তার পরিচর্যা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটির গুণাগুণ ও পরিবেশ অনুযায়ী কোন গাছ কোন অঞ্চলে চাষের উপযোগী, তারও গবেষণা চলছে। আমকে কীভাবে আরও উপাদেয় ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন করা যায়, তা নিয়েও পরীক্ষানিরীক্ষা করা হচ্ছে। সব ঋতুতে আমের ফলন হবে, এমন গাছ উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে। ছোট আকৃতির আমগাছ উদ্ভাবনের ফলে এখন শহর বা গ্রামের আঙিনাতেও আমগাছের চাষ করা যাচ্ছে।
উপসংহার
আমগাছ বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় একটি গাছ। দেশের মানুষের খাদ্যচাহিদা মেটানো, প্রয়োজনীয় কাঠের যোগান ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের উচিত আরও বেশি বেশি আমগাছ লাগানো ও এর পরিচর্যা করা।
ভূমিকা
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের একটি জাতীয় পশু রয়েছে। এ-পশু হলো বাঘ। একে বলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ বন সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখতে পাওয়া যায়। সুন্দরবনের অবস্থান বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল খুলনা-সাতক্ষীরা-বাগেরহাট জেলায়।

আকৃতি
বাঘ বিড়াল প্রজাতির প্রাণী। বাঘ আকারে ও শক্তিতে অনেক বড়। বাঘের গায়ের রং হলুদ। হলুদের মধ্যে কালো কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে। বাঘ সাধারণত বারো ফুট লম্বা এবং চার ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। এদের দাঁত খুবই তীক্ষ্ণ ও ধারালো হয়। পায়ের থাবায় তীক্ষ্ণ ও ধারালো নখ লুকানো থাকে। বিড়ালের মতো প্রয়োজনে এরা সেই নখ বের করে আক্রমণ করতে পারে। এদের পায়ের তলায় নরম মাংসপিণ্ড আছে। যার ফলে তারা নীরবে চলাফেরা করতে পারে এবং সহজে শিকার ধরতে পারে। এদের গায়ের চামড়া খুবই শক্ত এবং ঘন লোমে ঢাকা। বাঘের পেছনের পায়ে জোর খুব বেশি। লাফ দিয়ে এরা অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। বাঘের মাথা গোলাকার ও বেশ বড়। এদের চোখ দুটি উজ্জ্বল এবং রাতের বেলা জ্বলজ্বল করে জ্বলে। বাঘ অন্ধকারে দেখতে পায়।
স্বভাব
বাঘ অত্যন্ত হিংস্র প্রাণী। এরা বনে থাকে। এরা খুবই শক্তিশালী ও ভয়ংকর হয়। অনেক বড় বড় প্রাণীকে এরা সহজে শিকার করে। বাঘের শক্তি ও রাজকীয় ভাবভঙ্গি দেখে একে বনের রাজা বলা হয়। বাঘ খুব দ্রুত দৌড়াতে পারে। এরা সাঁতারও কাটতে পারে খুব ভালো। সুন্দরবনের বাঘের সুনাম সারা পুথিবী জুড়ে। এ-বাঘের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম জুড়ে রাখা হয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বাঘ সাধারণত হরিণ, শূকর, গরু, ছাগল শিকার করে থাকে। শিকার না পেলে এরা অনেক সময় মানুষ শিকার করে। একটা বাঘিনী সাধারণত বছরে দুই থেকে পাঁচটা বাচ্চা দেয়। বাচ্চাদের প্রতি বাঘের মায়া খুব কম। ক্ষুধা পেলে এরা বাচ্চাদেরও খেয়ে ফেলতে পারে। তাই বাঘিনী বাচ্চা বড় না হওয়া পর্যন্ত লুকিয়ে রাখে।
উপসংহার
বাঘকে হিংস্র পশু মনে হলেও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাঘের প্রয়োজনে রয়েছে। বাঘ তৃণভোজী প্রাণী খেয়ে এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে। কেননা, তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তারা বনের গাছপালা খেয়ে উজাড় করে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশের গৌরব। এদেরকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।
ভূমিকা
"... কোকিল ডাকে কুহু কুহু
দোয়েল ডাকে মুহু মুহু
নদী যেথায় ছুটে চলে
আপন ঠিকানায়
একবার যেতে দে-না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়।"
বাংলাদেশ অসংখ্য রূপ-রং-কণ্ঠের পাখির সমারোহে সমৃদ্ধ। যে-পাখির গান আর ডালে ডালে নেচে বেড়ানো দেখে মনে চঞ্চলতা জাগে, তার নাম দোয়েল। বাংলার অতি পরিচিত এক পাখি। দোয়েল বাংলাদেশে গানের পাখি হিসেবেও স্বীকৃত।
আকৃতি
আকৃতির দিক থেকে দোয়েল ছোট পাখি। এরা সাধারণত ৫-৬ ইঞ্চি লম্বা হয়। স্ত্রী ও পুরুষ দোয়েল রং, আকার ও চেহারায় পৃথক হয়। পুরুষ দোয়েলের মাথা, ঘাড়, গলা, বুক ও পিঠের পালক চকচকে নীলাভ কালো। নিচের বাকি অংশের পালক সাদা। এদের ডানা কালচে বাদামি রঙের, তার মাঝে পিঠঘেঁষে সাদা ছোপ আর আর টানা দাগ। লেজ লম্বা, সরু থেকে মোটা। লেজে মাঝের দুটো পালক কালো, বাকি অংশ সাদা, এদের চোখ ও ঠোঁট কালো এবং পা গাঢ় সিসা রঙের। স্ত্রী দোয়েলের রং অনেকটা বাদামি ও ধূসর, দেখতে ময়লা বালির মতো। দোয়েল সবসময় তার লেজ উঁচু করে রাখে।
খাদ্য ও বাসস্থান
পোকামাকড় দোয়েলের প্রধান খাদ্য। আকারে ছোট বলে এদের তেমন বেশি খাদ্যের প্রয়োজন হয় না। দোয়েল শস্যকণাও খেয়ে থাকে। এদের শিমুল ও মাদার ফুলের মধু খেতেও দেখা যায়। দোয়েল ঝোপঝাড়ে একাকী বা জোড়াসহ বাসা বেঁধে বাস করে। মানুষের বসতের কাছাকাছি দেয়াল কিংবা গাছের গুঁড়িতেও এরা বাসা বাঁধে। দোয়েল গাছের ডালে বাসা বাঁধতে পারে না। এরা খড়-কুটো বা শুকনো ঘাস জমা করে বাসা তৈরি করে।
প্রকৃতি
দোয়েল চঞ্চল এবং অস্থির প্রকৃতির পাখি। নাচের ঢঙে এরা লাফিয়ে চলে। মাটি থেকে দশ ফুট উচ্চতার ভেতরে এরা অল্প দূরত্বে উড়ে চলে। এদের দীর্ঘক্ষণ শূন্যে ভাসতে দেখা যায় না।
বিশেষত্ব
দোয়েলের বিশেষত্ব এর মোহনীয় সুরে ও সংগীতে। আকর্ষণীয় এই আদুরে পাখিটি সুন্দর সুরে গান করে এবং আস্তে আস্তে শিস দেয়। বসন্তকালে এদের নাচ ও গানে মন ভরে ওঠে। একেক্ষে কোকিল সবচেয়ে, পরিচিত সেটি তবে অতিথি গানের পাখি। আর এরা আমাদের একান্তই প্রকৃতির গানের পাখি। সারাদিন এমনকি সন্ধ্যার পরও দোয়েল গান গায়।
কেন জাতীয় পাখি
বাংলার প্রকৃতির সঙ্গে দোয়েলের রূপ, রং, স্বভাব, গান মিশে আছে। দোয়েল তার সহজাত চঞ্চলতায় গাছের ডালে বসে যখন গান করে ও শিস দেয়, তখন বাঙালি বাংলার অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে। বাংলার সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বলেই দোয়েল আমাদের জাতীয় পাখি।
উপসংহার
বাংলাদেশের সর্বত্র দোয়েল পাখি দেখা যায়। প্রকৃতির প্রতিকূলতা, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে জীববৈচিত্র্যে যে ক্ষতি হচ্ছে, তাতে এ-পাখিও রেহাই পাচ্ছে না। দোয়েল তথা সব পাখির জন্ম, বৃদ্ধি ও বিকাশ নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব।
১। প্রবন্ধ লেখ:
ক) শীতের সকাল। [সংকেত: ভূমিকা, শীতের সকাল, রূপবদল, শহরে শীতের সকাল, গ্রামে শীতের সকাল, শীতের সকালে খাওয়াদাওয়া, উপসংহার।]
খ) বাংলাদেশের নদনদী [সংকেত: ভূমিকা, বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদী, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলী, নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, উপকারিতা, অপকারিতা, নদীভাঙন, উপসংহার।]
Read more